![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের গতি আরও কমেছে। গতকাল শনিবার বিশেষ কর্মদিবসে বাজারটিতে মোট ৩১৭ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা গত বছরের ২৯ ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। অর্থাৎ, চলতি বছরের মধ্যে এক দিনে এত কম লেনদেন আর হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই নানা কারণে শেয়ারবাজারে লেনদেন কমছিল। এর মধ্যে ডিএসইর দুর্যোগকালীন তথ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র বা ডিজেস্টার রিকভারি (ডিআর) ডেটা সেন্টার রাজধানীর নিকুঞ্জ থেকে কারওয়ানবাজারে স্থানান্তরের পর বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসে লেনদেন বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি ব্রোকারেজ হাউসে এ সমস্যা দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাজারে লেনদেন কমার পেছনে এটিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গতকাল সকাল ১০টার পর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন ছোট-বড় ব্রোকারেজ হাউসে কমবেশি লেনদেনের সমস্যা হয়। আইসিবি, আইডিএলসি ও আইল্যান্ড সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আধাঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত লেনদেন বিঘ্নিত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, নতুন ডিআর সেন্টার চালুর আগে টানা তিন দিন পরীক্ষামূলক লেনদেন করা হয়েছিল। সে সময় কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। কিন্তু সরাসরি বা লাইভ লেনদেন শুরুর প্রথম দিনেই বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জটিলতা তৈরি হয়। তবে ডিএসইর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমস্যার কারণ জানানো হয়নি।
ডিএসইর জনসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুর রহমান বলেন, লেনদেন বিঘ্নিত হওয়ার বেশ কিছু অভিযোগ তাঁরা পেয়েছেন। তবে ঠিক কী কারণে সমস্যাটি হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই। তিনি জানান, গতকাল প্রথমবারের মতো ঢাকার কারওয়ানবাজারের একটি ভবনে স্থানান্তরিত ডিআর সেন্টার থেকে লেনদেন পরিচালিত হয়েছে। এর আগের বৃহস্পতিবার নিকুঞ্জের ডেটা সেন্টার থেকে লেনদেন হয়েছিল।
লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাফফাত রেজা সমকালকে বলেন, কারওয়ানবাজারের ডিআর সেন্টার থেকে লেনদেন শুরুর দিনে অনেক ব্রোকারেজ হাউসে সমস্যা হওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। তবে সমস্যার সুনির্দিষ্ট কারণ তাঁর জানা নেই। তাঁর প্রতিষ্ঠানে লেনদেন বিঘ্নিত হয়নি বলেও জানান তিনি।
সাফফাত রেজার মতে, বড় ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে লেনদেন ব্যাহত হলে বাজারের মোট লেনদেন কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে তাঁর বিবেচনায় এ সমস্যা সাময়িক। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কারণেও আগে থেকে লেনদেন কমছিল। নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরালো হওয়ার পর লেনদেন কমেছে বলেও অনেকে মনে করছেন।
ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, একটি সমস্যা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাজারের বিভিন্ন জটিলতার তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হচ্ছে না বলে তাঁদের ধারণা। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ২০০ কোটি টাকার এ তহবিলের পাঁচ বছরের মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। বিশেষ তহবিলের আওতায় কয়েকটি ব্যাংক প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থ ফেরত দিতে ব্যাংকগুলো শেয়ার বিক্রি করলে বাজারে বড় দরপতনের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এ উদ্বেগে ছোট-বড় অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বিনিয়োগ থেকে বিরত রয়েছেন। পরিস্থিতি এড়াতে ব্রোকারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির চেয়ারম্যান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলে স্কিমটির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
শীর্ষ এক মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে এসে সাময়িক বা ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। বিনিয়োগকারীরা নেতিবাচক খবর পেলে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে যান। এ ধরনের পরিস্থিতি বারবার তৈরি হলে তাঁরা একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তাঁর মতে, বাজারে লেনদেন কমার পেছনে এ প্রবণতারও প্রভাব রয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১৬ আগস্ট ডিএসইতে সর্বশেষ এক দিনে এক হাজার কোটি টাকার বেশি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল। গত ২ জুন থেকে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ৫২ কর্মদিবসের মধ্যে ৪২ দিনই লেনদেন এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। এর মধ্যে ১২ জুলাই এক দিনে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকার বেশি। এরপর থেকে লেনদেন ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
গতকালের লেনদেন আগের দিনের তুলনায় ১৮২ কোটি টাকা কম ছিল। বস্ত্র খাতে লেনদেন কমেছে ৫৩ কোটি টাকা, ফলে তা ৮০ কোটি টাকার নিচে নেমেছে। প্রকৌশল খাতে লেনদেন সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা কমে ২৮ কোটি টাকার নিচে নেমেছে। ওষুধ ও রসায়ন খাতে লেনদেন ২৬ কোটি টাকা কমে পৌনে ৩০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
লেনদেনের পাশাপাশি অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদরও কমেছে। লেনদেনযোগ্য ৩৫২টি কোম্পানির মধ্যে ৮৯টির দর বেড়েছে, আর কমেছে ২১১টির। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত ছাড়া অন্য সব খাতের বেশির ভাগ শেয়ারের দর এদিন কমেছে।