• হোম > জাতীয় | দেশজুড়ে > ৩০০ বিঘার এবিজি স্পোর্টস সিটি,বদলে যাচ্ছে ক্রীড়াচর্চার পরিসর

৩০০ বিঘার এবিজি স্পোর্টস সিটি,বদলে যাচ্ছে ক্রীড়াচর্চার পরিসর

  • রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৩
  • ২৮

---

ইবি রিপোর্ট

আন্তর্জাতিক মানের মাঠ, আধুনিক প্রশিক্ষণসুবিধা, খেলোয়াড়দের জন্য জিম ও পুনর্বাসনব্যবস্থা—একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া পরিবেশ গড়ে তুলতে এসব সুবিধার সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে এমন অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। এই বাস্তবতায় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা এবিজি স্পোর্টস সিটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ফুটবল ও ক্রিকেটের পাশাপাশি স্কোয়াশ, হকি এবং অন্যান্য খেলার অবকাঠামো গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে বেসরকারি এই উদ্যোগ দেশের ক্রীড়াচর্চাকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ক্রীড়া কমপ্লেক্সের লক্ষ্য শুধু খেলার মাঠ নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতার আয়োজন, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরিও এর পরিকল্পনার অংশ। বিভিন্ন খেলার জন্য একই স্থানে মাঠ ও প্রশিক্ষণসুবিধা গড়ে ওঠায় এটি বহুমুখী ক্রীড়া কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে কিংস অ্যারেনার অভিষেক

এবিজি স্পোর্টস সিটির সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা। জাতীয় স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে এই মাঠ বাংলাদেশের জন্য বিকল্প ভেন্যু হিসেবে সামনে আসে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের হোম ম্যাচ, এএফসি কাপের ম্যাচ এবং দক্ষিণ এশীয় বয়সভিত্তিক নারী ফুটবল প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে মাঠটি দেশের ফুটবলে পরিচিতি পেয়েছে।

২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান কিংস অ্যারেনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরের বছর ৩ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাঠটিতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ফুটবল আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভেন্যুটির ব্যবহার বেড়েছে।

কিংস অ্যারেনার মাঠ ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যালোচনারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ভারতের ফিফা প্রীতি ম্যাচকে সামনে রেখে গত আগস্টে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের জাতীয় স্টেডিয়াম ও কিংস অ্যারেনা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদলটি কিংস অ্যারেনার মাঠ, অনুশীলন গ্রাউন্ড, খেলোয়াড়দের জিম ও পুনরুদ্ধার-সুবিধার প্রশংসা করে। আন্তর্জাতিক দলগুলোর প্রয়োজন বিবেচনায় মাঠ ও প্রশিক্ষণসুবিধা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের পর্যালোচনা প্রাসঙ্গিক।

আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী ভেন্যু দেশে থাকলে খেলোয়াড়দের নিজেদের মাঠে খেলার সুযোগ বাড়ে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন, মাঠ ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সেবার অভিজ্ঞতাও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে জমা হয়।

একাডেমিতে খেলোয়াড় তৈরির পরিকল্পনা

আধুনিক মাঠ থাকলেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হয় না। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচিং, পর্যাপ্ত অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগও প্রয়োজন। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর এবিজি স্পোর্টস সিটিতে অনাবাসিক ফুটবল একাডেমি চালু করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ডরমিটরি নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে আবাসিক একাডেমি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিভাবান তরুণদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। একাডেমি থেকে ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলার উঠে আসবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এবিজি চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরও বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে ফুটবল প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। বসুন্ধরা স্পোর্টস কমপ্লেক্সের একাডেমি থেকে ভালো মানের খেলোয়াড় উঠে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্রীড়াঙ্গনে বিনিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এলে দেশের খেলাধুলার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলার স্বপ্নও তুলে ধরেন তিনি।

ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটেও কার্যক্রম বিস্তৃত হচ্ছে। আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দল মালয়েশিয়ার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। আন্তর্জাতিক দলের সফর সামনে রেখে প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ মাঠে প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের খেলাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে এবিজি ক্রিকেট নেটওয়ার্ক দল ক্রিকেট লিগে অংশ নেওয়া শুরু করেছে। এসব কার্যক্রম প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত খেলার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

স্কোয়াশ, কমব্যাট স্পোর্টস ও হকিতেও আয়োজন

ফুটবল ও ক্রিকেটের বাইরে অন্যান্য খেলাতেও কার্যক্রম চালাচ্ছে এবিজি স্পোর্টস সিটি। সম্প্রতি এখানে আন্তর্জাতিক স্কোয়াশ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশের খেলোয়াড়েরা অংশ নেন। সাত দেশের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক কমব্যাট স্পোর্টস প্রতিযোগিতা জুলকান ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসর ‘জেডএফসি-২: প্রাইড অব বাংলাদেশ’ আয়োজন করা হয়েছে।

হকির জন্য অ্যাস্ট্রোটার্ফ স্থাপনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এটি চালু হলে আধুনিক মাঠে অনুশীলন ও প্রতিযোগিতা আয়োজনের সুযোগ বাড়বে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক হকি ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট আয়োজনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্রীড়াচর্চা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে চলতি মাসে ১০টি করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতার পরিসর বাড়ানোরও উদ্যোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলায় যুক্ত করা গেলে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং প্রতিযোগিতামূলক খেলায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়তে পারে।

এ ছাড়া কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাবকে নিয়ে ক্রীড়া ও বিনোদন উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ক্রীড়াপ্রেমীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিস্তার

বাংলাদেশে খেলাধুলার উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। মাঠ নির্মাণ, প্রশিক্ষণসুবিধা তৈরি, দল পরিচালনা এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দরকার। এবিজি স্পোর্টস সিটি এসব ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

১৯৮০-এর দশক থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত বসুন্ধরা গ্রুপ ২০১৯ সালে স্পোর্টস সিটি গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এবং তাঁর চার ছেলে সাদাত সোবহান তানভীর, সাফিয়াত সোবহান সানভীর, সায়েম সোবহান আনভীর ও সাফওয়ান সোবহান তাসভীর এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।

এবিজি স্পোর্টস সিটির পরিচালক, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি, বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি এবং বসুন্ধরা গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. ইমরুল হাসান বলেন, খেলাধুলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর মতে, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ফলে বিভিন্ন খেলায় প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ছে। এর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এসব উদ্যোগের সুফল দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আরও বেশি দেখা যাবে বলে তাঁরা আশাবাদী।

ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় আবদুস সাদেকও বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি মাঠ ও স্টেডিয়াম নির্মাণ, বসুন্ধরা কিংসের সাফল্য, ক্রিকেটে গ্রুপটির আগ্রহ এবং হকির জন্য টার্ফ স্থাপনের কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে প্যাডেল টেনিসের প্রসারেও উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দল গঠন ও পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এলে দেশের খেলাধুলা আরও সমৃদ্ধ হবে।

তরুণদের খেলাধুলায় যুক্ত করার মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকাসক্তি ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রেও এমন অবকাঠামো ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব ফল নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, নিয়মিত প্রতিযোগিতা, খেলোয়াড়দের অগ্রগতি এবং সুযোগ-সুবিধার ধারাবাহিক ব্যবহারের ওপর।

নতুন স্থাপনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এবিজি স্পোর্টস সিটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কয়েকটি নতুন স্থাপনা রয়েছে। ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নাম ‘শাহ আলম ক্রিকেট স্টেডিয়াম’, হকি স্টেডিয়ামের নাম ‘আবদুস সাদেক স্টেডিয়াম’ এবং আন্তর্জাতিক মানের সুইমিংপুলের নাম ‘আবদুস সোবহান সুইমিংপুল’ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শাহ আলম ও আবদুস সাদেকের নামে ক্রীড়া স্থাপনার নামকরণের মধ্য দিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁদের অবদান স্মরণ করার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে আবদুস সোবহান ছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের বাবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের একজন। তিনি ভালো সাঁতারু ছিলেন এবং তৎকালীন বেঙ্গল দলের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর নামে সুইমিংপুলের নামকরণের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট অতীতকে সম্মান জানানো হচ্ছে।

এবিজি স্পোর্টস সিটির পরিচালক ইমরুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নয়; বরং দেশের খেলাধুলার পরিসর বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরা। বিভিন্ন খেলার অবকাঠামো, একাডেমি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আয়োজনকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19896 ,   Print Date & Time: Sunday, 18 October 2026, 02:24:22 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh