![]()
ইবি রিপোর্ট
বিশ্ববাজারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত থার্মাল বা তাপীয় কয়লার দাম চলতি বছরের শুরু থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধিতে কয়লার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি প্রধান রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ দুই কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার বাজারে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত অস্ট্রেলিয়ার উন্নত মানের তাপীয় কয়লার ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তিমূল্য বর্তমানে টনপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলার। গত ৬ অক্টোবর দাম বেড়ে টনপ্রতি প্রায় ১৫২ ডলারে উঠেছিল, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ। খবর নিক্কেই এশিয়ার।
এলএনজির দাম বাড়ায় কয়লার চাহিদা
ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এলএনজির দাম বেড়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর কাছে কয়লা প্রধান ও তুলনামূলক সস্তা বিকল্প জ্বালানি হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে কয়লার চাহিদা বেড়ে রেকর্ড ৮৯৪ কোটি টনে পৌঁছতে পারে। গত বছরের তুলনায় এ চাহিদা ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু চাহিদা বৃদ্ধি নয়, প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর সরবরাহ সীমাবদ্ধতাও কয়লার দাম বাড়ার বড় কারণ। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমোডিটি ইনসাইটসের পরিচালক মার্ক গ্রেসওয়েল এ বিষয়ে সরবরাহের সীমাবদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি কমার আশঙ্কা
বিশ্বের অন্যতম প্রধান কয়লা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়ায় খনি অনুমোদনের শর্ত কঠোর করেছে সরকার। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে কয়লা সরবরাহের বাধ্যবাধকতাও জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে দেশটির রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার কয়লা রপ্তানি প্রায় ১০ শতাংশ কমে ৪৫ কোটি টনে নেমে আসতে পারে। গ্রেসওয়েলের মতে, ২০০০ সালের পর বাজারে দাম ২০ শতাংশ বাড়লেও রপ্তানি কমে যাওয়ার এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
অস্ট্রেলিয়ায় আইনি জটিলতা
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় নীতিগত ও আইনি জটিলতার কারণে কয়লা সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দেশটির হাইকোর্ট নিউ সাউথ ওয়েলসের গুরুত্বপূর্ণ মাউন্ট প্লেজ্যান্ট কয়লা খনির কার্যক্রম চালু রাখার অনুমতি বাতিল করেছেন। এতে দেশটির কয়লা সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে একই অঙ্গরাজ্যে গ্লেনকোর ও ইয়ানকোল অস্ট্রেলিয়ার পরিচালিত আরেকটি খনির মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে রাজ্যের স্বাধীন পরিকল্পনা কমিটি।
জাপানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি ক্রস এক্সিকিউটের প্রেসিডেন্ট মাসাতাকা ফুরুইয়াকা বলেছেন, নীতিগত ও বিচারিক সিদ্ধান্ত এখন বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর সরবরাহের পূর্বাভাসে আগের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়ছে জ্বালানি নিশ্চয়তার চ্যালেঞ্জ
কয়লার দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে জাপানের মতো উন্নত দেশগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তুলনামূলক কম দক্ষতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও সচল রাখছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেই হবে না; নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি, কয়লার বাড়তি চাহিদা এবং প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বজায় থাকতে পারে।