• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > ফুডপান্ডার ব্যবসায়িক মডেল: রেস্তোরাঁর আয়, গ্রাহকের বাড়তি খরচ

ফুডপান্ডার ব্যবসায়িক মডেল: রেস্তোরাঁর আয়, গ্রাহকের বাড়তি খরচ

  • রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩১
  • ২৮

---

ইবি রিপোর্ট

কমিশন, সার্ভিস চার্জ, পেমেন্ট ফি, অর্ডার বাতিলের জরিমানা এবং পাওনা পরিশোধে বিলম্ব—এসব বিষয় নিয়ে খাবার ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়ায় ব্যবসার মুনাফা কমছে। অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, অ্যাপে খাবারের দাম সরাসরি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার তুলনায় বেশি পড়ে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগর রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সমিতি ফুডপান্ডার মোট চার্জ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে সীমিত করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলো মানা না হলে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁগুলো সম্মিলিতভাবে প্ল্যাটফর্মটির অর্ডার নেওয়া বন্ধ করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংগঠনটি। ঢাকার রেস্তোরাঁ মালিকেরাও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন।

ফুডপান্ডা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রতিষ্ঠানটি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে এবং প্রতিটি সহযোগী রেস্তোরাঁর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করে।

ফুডপান্ডা যেভাবে আয় করে

ফুডপান্ডা অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহক, রেস্তোরাঁ এবং ডেলিভারি কর্মীদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। অর্ডার গ্রহণ, পেমেন্ট ও খাবার পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে কমিশন, ডেলিভারি ও সার্ভিস ফি, অনবোর্ডিং চার্জ এবং অর্থের বিনিময়ে প্রচারণা। রেস্তোরাঁর সঙ্গে চুক্তি ও নেওয়া সেবার ধরন অনুযায়ী চার্জের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, কমিশনের বাইরেও ভ্যাট, অনলাইন পেমেন্ট ফি, ওয়েটিং চার্জ, ট্যাবলেট কম্পিউটারের ভাড়া এবং ইন্টারনেট খরচের মতো বিভিন্ন খাতে অর্থ কাটা হয়।

একটি উদাহরণে, কোনো রেস্তোরাঁর ১০ হাজার টাকার খাবার বিক্রিতে কমিশন ৩০ শতাংশ এবং অন্যান্য ফি ও সমন্বয় ২০০ টাকা ধরা হলে, কমিশন বাবদ কাটা যাবে ৩ হাজার টাকা। এই ৩ হাজার ২০০ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসাব করলে আরও ৪৮০ টাকা কাটা হবে। ফলে রেস্তোরাঁর হাতে থাকবে ৬ হাজার ৩২০ টাকা।

অন্যদিকে মোট চার্জ ১৫ শতাংশ হলে একই বিক্রি থেকে রেস্তোরাঁর হাতে থাকবে ৮ হাজার ৫০০ টাকা। এটি কেবল উদাহরণভিত্তিক হিসাব; ফুডপান্ডার সব রেস্তোরাঁর জন্য প্রযোজ্য বা যাচাইকৃত অভিন্ন চার্জের তালিকা নয়। হাতে থাকা অর্থও নিট মুনাফা নয়। খাবারের উপকরণ, কর্মীদের বেতন, প্যাকেজিং, দোকানভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় এখান থেকেই মেটাতে হয়।

অ্যাপে খাবারের দাম বেশি, অভিযোগ গ্রাহকদের

রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুননাহার জানান, সরাসরি রেস্তোরাঁর তুলনায় ফুডপান্ডায় খাবারের দাম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার এক প্লেট সাদা পোলাও ও চিকেন রোস্ট অর্ডার করতে তাঁর খরচ হয়েছিল ৩৩০ টাকা। অথচ রেস্তোরাঁয় গিয়ে একই খাবার খেতে সাধারণত ২২০ থেকে ২৫০ টাকা লাগে। পরে অর্ডার বাতিল করে সরাসরি রেস্তোরাঁয় গিয়ে তিনি ২২০ টাকায় খাবারটি কেনেন।

গুলশানের বাসিন্দা রাকিবুর রহমান জানান, ফুডপান্ডার মাধ্যমে খিচুড়ি ঘর থেকে বিফ খিচুড়ি অর্ডার করতে ফি ও ভ্যাটসহ তাঁর প্রায় ৩৫০ টাকা খরচ হয়েছে। রেস্তোরাঁয় বসে খেলে একই খাবারের দাম পড়ত ২৫০ টাকা।

ঢাকার মগবাজারে কাচ্চি ভাইয়ের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম বলেন, প্ল্যাটফর্মে খাবারের যে দাম দেখানো হয়, তার ওপর রেস্তোরাঁগুলোর নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তবে ফুডপান্ডার দাবি, খাবারের দাম রেস্তোরাঁগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করে এবং এ বিষয়ে প্ল্যাটফর্মটি কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না।

চার্জের হিসাব ও পাওনা পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সেক্রেটারি মঞ্জুরুল হক বলেন, পাওনা পরিশোধের হিসাববিবরণী জটিল হওয়ায় কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা বুঝতে রেস্তোরাঁগুলোর সমস্যা হয়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশীয় ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো যখন সমন্বিত কমিশন কাঠামোয় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে, তখন ফুডপান্ডার কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়ার প্রয়োজন কেন হচ্ছে।

রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, খাবার তৈরির পর অর্ডার বাতিল হলে লোকসান তাঁদেরই বহন করতে হয়। আবার ডেলিভারি কর্মীর দেরির কারণে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেস্তোরাঁকে জরিমানা দিতে হয়। গ্রাহকের অভিযোগ যাচাই না করে অর্থ কেটে নেওয়া এবং পাওনা পেতে ১৩ দিন বা তারও বেশি সময় লাগার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন মালিক।

ব্যবসায়ী সমিতির ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—মোট চার্জ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে সীমিত করা, খাতভিত্তিক কর্তনের বিস্তারিত বিবরণী দেওয়া, রেস্তোরাঁর ত্রুটি ছাড়া অর্ডার বাতিল হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ডেলিভারি কর্মীর বিলম্বের কারণে জরিমানা বন্ধ করা, যাচাইবিহীন অভিযোগে অর্থ কেটে নেওয়া থেকে সুরক্ষা এবং সাত দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধ।

এ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

অভিন্ন কমিশনের প্রস্তাবে ফুডপান্ডার আপত্তি

ফুডপান্ডার দাবি, প্রতিটি রেস্তোরাঁর ব্যবসার ধরন, কাজের পরিধি ও সেবার মান বিবেচনায় নিয়ে আলাদা চুক্তি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা কোনো তৃতীয় পক্ষ বা সমিতির মাধ্যমে নয়, সরাসরি অংশীদার রেস্তোরাঁর সঙ্গে চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা করে। সব রেস্তোরাঁর জন্য একই কমিশন নির্ধারণ করা হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্নতা বিবেচনায় নেওয়া কঠিন হবে বলেও মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।

ফুডপান্ডার বক্তব্য, প্রযোজ্য চার্জের বাইরে তারা নিজে থেকে ভ্যাট আরোপ করে না; করের হার সরকার নির্ধারণ করে। লেনদেনের ধরন ও প্রযোজ্য করবিধি অনুযায়ী খাবারের দাম এবং প্ল্যাটফর্মের সেবায় আলাদাভাবে ভ্যাট প্রযোজ্য হতে পারে।

ফুডপান্ডা বাংলাদেশ লিমিটেডের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের প্রধান জাহেদুল ইসলাম বলেন, রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্ব দেয় এবং যৌক্তিক উদ্বেগ সমাধানে অংশীদারদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে।

তবে বিভিন্ন শ্রেণির রেস্তোরাঁর কাছ থেকে কোন খাতে কত চার্জ নেওয়া হয় কিংবা কীভাবে সব ফি হিসাব করা হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ বা নমুনা ইনভয়েস প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ করেনি।

অর্ডার বাতিলের ক্ষতি কে বহন করবে

ফুডপান্ডা বলেছে, বাতিল হওয়া অর্ডারের বিপরীতে তারা গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ পায় না। রেস্তোরাঁর লোকসান কমাতে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব তহবিল থেকে খাবারের খরচের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বহন করে এবং কিছু ক্ষেত্রে খাবার রেস্তোরাঁয় ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে। অর্ডার বাতিলের কারণে বিপণন, লজিস্টিকস ও গ্রাহক তৈরির ব্যয়ও তাদের বহন করতে হয় বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে অর্ডার বাতিলের দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়, অর্থ কেটে নেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রমাণ বিবেচনা করা হয় এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রেস্তোরাঁগুলোর আপত্তি জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না—এসব প্রশ্নের সমাধান এখনো আলোচনার বিষয়।

স্বচ্ছ নীতিমালার দাবি

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও কাদেরিয়া রেস্তোরাঁর চেয়ারম্যান ফিরোজ আলম সুমনের দাবি, ফুডপান্ডার অর্ডারে রেস্তোরাঁগুলোর মুনাফার হার সাধারণত ৫ থেকে ৭ শতাংশের বেশি হয় না; কখনো তা ১ থেকে ২ শতাংশে নেমে আসে।

তিনি বলেন, ফুডি ও পাঠাও ফুডের মতো দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নেয়, যেখানে ফুডপান্ডার কমিশন তুলনামূলক বেশি বলে তাঁদের অভিযোগ। বিক্রির এক সপ্তাহ পর পাওনা পরিশোধ করা হলে রেস্তোরাঁগুলোর চলতি মূলধন আটকে থাকে বলেও জানান তিনি।

ফিরোজ আলম সুমনের মতে, মোট চার্জের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি ফি-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ, খাতভিত্তিক হিসাববিবরণী, অর্ডার বাতিলের সিদ্ধান্তে উপযুক্ত প্রমাণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এসব ব্যবস্থা নেওয়া হলে রেস্তোরাঁ ও ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের মধ্যকার বিরোধ কমানো সম্ভব।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19864 ,   Print Date & Time: Sunday, 18 October 2026, 10:32:38 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh