![]()
ইবি রিপোর্ট
সেনাসদস্যদের অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষাকে আগামীর বাংলাদেশের প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে সাভার ক্যান্টনমেন্টে কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে জাতীয় পতাকা প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে চায় বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান, কূটনৈতিক কোরের প্রতিনিধিরা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাসদস্যদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ইতোমধ্যে জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের বেড়ে ওঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিন্ন পরিচয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও সেনা পরিবেশ তাঁর কাছে পরিচিত।
পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট জাতীয় পতাকা বা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্জন করেছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই পতাকা কেবল একটি প্রতীক নয়; এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারের পরিচায়ক।
তিনি বলেন, জাতীয় পতাকা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই পতাকা অর্জনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব আরও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের নতুন শপথ নিতে হয়। পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা প্রত্যেক সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর হামলা শুরু হলে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা করেন।
তারেক রহমান বলেন, ওই ঘোষণা দেওয়ার পর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ফিরে বাংলাভাষী কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একত্র করেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধে ওই ঘটনার বিবরণ রয়েছে।
নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও, আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিলো। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনোদিন ভুলবে না। কো-নো-দি-ন না।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব তথ্য ১৯৭২ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা, ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা এবং ১৯৮০ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ১, ২, ৩, ৪ ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাভাষী সেনাসদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে একজন সেনা কর্মকর্তার এই ভূমিকা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলের ওপর নির্ভর করে না। শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ, জনগণের আস্থা এবং চেইন অব কমান্ডের ওপরও এর সক্ষমতা নির্ভরশীল। সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সৈনিক সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকবেন—এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। এ বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে সময়োপযোগী করার কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশে উৎপাদনের জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠায় সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতা গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
তিনি জানান, দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করে। বিদেশে শান্তিরক্ষা মিশনেও বাহিনীর সদস্যরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।