![]()
ইবি রিপোর্ট
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে কনফিডেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। এ লক্ষ্যে আগামীকাল রোববার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য রোড শো আয়োজনের কথা রয়েছে কোম্পানিটির। আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বর্তমানে কনফিডেন্স পাওয়ার একাধিক ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২৯৩ মেগাওয়াট। পাশাপাশি ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে কোম্পানিটি। এর একটি অংশ নিজস্ব উদ্যোগে এবং বাকি অংশ ডোরিন পাওয়ার ও কনফিডেন্স এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন আইপিও বাজারে আসার উদ্যোগকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানির পারফরম্যান্স নিয়ে অতীতে প্রশ্ন ওঠায় এ আইপিও নিয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির শেয়ারের দর ও ব্যবসায়িক অবস্থান নিয়েও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কনফিডেন্স গ্রুপের আগে থেকে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স সিমেন্ট পিএলসির আর্থিক পারফরম্যান্সও আলোচনায় এসেছে।
লভ্যাংশে দীর্ঘ রেকর্ড, সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে হার
বেসরকারি খাতের প্রথম সিমেন্ট কোম্পানি হিসেবে কনফিডেন্স সিমেন্ট ১৯৯৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা ও আয় ধরে রাখার কারণে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। সিমেন্টের ব্যবসার পাশাপাশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগও করেছে কোম্পানিটি।
তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ১১ টাকা ২৩ পয়সা আয় করেও মাত্র ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করায় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের একাংশের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। এতে শেয়ারপ্রতি নগদ লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ টাকা ১২ পয়সা।
এ বিষয়ে কনফিডেন্স সিমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান করিম বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হয়। তাঁর মতে, এ কৌশল কোম্পানির প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে এবং ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
ইমরান করিম আরও বলেন, কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিতে ধীরগতি চলছে এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অবকাঠামো নির্মাণ কমে যাওয়ায় সিমেন্টের চাহিদা কমেছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলেও কোম্পানি যাতে ধাক্কা সামলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে, সে বিবেচনায় গত অর্থবছরে লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, গত ৩০ বছরে কনফিডেন্স সিমেন্ট গড়ে ১৮ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির প্রথম বছর কোম্পানিটি ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। ২০১০ সালে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ বোনাস ছিল। ২০১৬ সালে নগদ লভ্যাংশের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
তালিকাভুক্তির পর ৩০ বছরের মধ্যে ১৫ বছর কোম্পানিটি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিয়েছে। পাঁচ বছর লভ্যাংশের হার ছিল ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২২ সাল থেকে ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছে। তালিকাভুক্তির পর থেকে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত গড় লভ্যাংশের হার ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা সিমেন্ট খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ সময়ে গড়ে সর্বোচ্চ লভ্যাংশ দিয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট।
পাঁচ বছরের গড় ইপিএসেও শীর্ষে
শেয়ারপ্রতি আয়ের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রেও কনফিডেন্স সিমেন্টের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের সাতটি কোম্পানির মধ্যে গত পাঁচ বছরে কনফিডেন্স সিমেন্ট ও লাফার্জহোলসিম ছাড়া অন্য কোম্পানিগুলো এক বা একাধিক বছর লোকসান করেছে।
এই পাঁচ বছরে কনফিডেন্স সিমেন্টের গড় শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৮ টাকা ১১ পয়সা, যা খাতের সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে কোম্পানিটির ইপিএস দাঁড়িয়েছিল ১৫ টাকা ৮৬ পয়সায়। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা হাইডেলবার্গ সিমেন্টের পাঁচ বছরের গড় ইপিএস ছিল ৪ টাকা ২৮ পয়সা।
অন্যদিকে, একই সময়ে আরামিট সিমেন্টের গড় শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১০ টাকা ৯৫ পয়সা এবং মেঘনা সিমেন্টের ৭ টাকা ৭০ পয়সা। প্রিমিয়ার সিমেন্টের গড় শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৮৩ পয়সা। লাফার্জহোলসিম ও ক্রাউন সিমেন্টের গড় শেয়ারপ্রতি আয় ছিল যথাক্রমে ৩ টাকা ৯২ পয়সা ও ৩ টাকা ৯৯ পয়সা।
মূলধন ও শেয়ার মালিকানা
১৯৯৫ সালে আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর একই বছর কনফিডেন্স সিমেন্ট ১:৪ অনুপাতে রাইট শেয়ার ইস্যু করে। পরে আরও দুই দফায় রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি আবার রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন করেছিল। তবে তৎকালীন কমিশনের মেয়াদে কোনো আইপিও ও রাইট শেয়ার অনুমোদন না পাওয়ায় কোম্পানিটি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে কনফিডেন্স সিমেন্ট ঢাকা লিমিটেড থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়।
বর্তমানে কনফিডেন্স সিমেন্টের পরিশোধিত মূলধন ৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং মোট শেয়ারসংখ্যা ৮ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের হাতে রয়েছে ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ শেয়ার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ শেয়ার।
কনফিডেন্স পাওয়ারের প্রস্তাবিত আইপিওর আগে গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি আয় ও লভ্যাংশের রেকর্ড তাই বিনিয়োগকারীদের আলোচনায় রয়েছে। তবে নতুন কোম্পানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কনফিডেন্স পাওয়ারের আর্থিক তথ্য, আইপিও মূল্যায়ন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।