• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ > দেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ

দেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ

  • শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৫
  • ২৭

---

ইবি রিপোর্ট

দেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বন্যায় কৃষির ক্ষতি এবং শিশুদের অপুষ্টির পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এসব উদ্বেগ তুলে ধরে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। বিভিন্ন জরিপে দারিদ্র্য বৃদ্ধির তথ্যও উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যার একটি অংশ সব সময় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন বলছে, সেই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। খাদ্যসংকট ও পুষ্টিহীনতার কারণে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি শিশুদের বিকাশে ঝুঁকি তৈরি করছে। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায়, অর্থাৎ বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় ওজন কম। প্রতি পাঁচটি পরিবারের দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে।

২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দেশে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং ১৩ লাখ মানুষ। কৃষিজমির ক্ষতির ফলে খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবিকা ব্যাহত হয়েছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিও দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে সেখান থেকে অর্থ পাঠানোর প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা বিগত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর কয়েক মাস খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার হার কিছুটা কমেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত ১৩ অক্টোবর পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি কমপক্ষে ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও একই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা যথেষ্ট ভালো বলে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, খাদ্যসংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা দেওয়া। নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার ও দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা, ন্যায্যমূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি চালানো এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19705 ,   Print Date & Time: Friday, 16 October 2026, 09:55:48 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh