• হোম > অর্থনীতি > থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পেতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় প্রস্তাব

থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পেতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় প্রস্তাব

  • শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:২০
  • ২১

---

ইবি রিপোর্ট

হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো নয়, এবার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পেতে প্রতিযোগিতা করছে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সংস্থাগুলো। এ কাজের জন্য কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং হাজারো স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রস্তাব দিয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে শুধু চাকরি সৃষ্টি যথেষ্ট নয়; গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা ও ইক্যুইটি অংশীদারত্বও নিশ্চিত করতে হবে।

বেবিচকের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাপানি কনসোর্টিয়াম চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রেখেছে। এগুলো হলো তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন, যুক্তরাজ্যের মেঞ্জিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডনাটা। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি তৃতীয় টার্মিনালে আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা ও প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনা করবে। এতে এ খাতে বিমানের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যের অবসান ঘটবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশের হাতেই থাকবে।

বেবিচকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, “কোনো বিদেশি কোম্পানি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেশনে যুক্ত হলেও স্থানীয় কর্মীদের আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাদের মূল কর্মীবাহিনীতে যুক্ত করা এবং সত্যিকারের দেশীয় অংশীদারত্ব তৈরি করা খুবই জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার মালিকানায় শেয়ার দেওয়া এক বিষয় নয়। তাঁর বক্তব্য, “বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত পুরো মুনাফা নিয়ে যাবে, নাকি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক শেয়ার বা মালিকানার অংশ দেবে—সেটিই এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য জাপান সফরের আগে চলতি মাসের শেষ দিকে চুক্তি চূড়ান্ত করতে জাপানি কনসোর্টিয়ামকে তাগাদা দিচ্ছে বেবিচক। তবে প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠার খসড়া চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। শুরুতে এতে এক হাজারের বেশি মন্তব্য ও সংশোধনী প্রস্তাব এসেছিল। এর মধ্যে ৯০ থেকে ৯৫টি বড় বিষয় বিস্তারিত আলোচনার জন্য চিহ্নিত করা হয়। কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তি চূড়ান্ত করতে বিলম্ব হচ্ছে।

রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে ২৭:৭৩ অনুপাতের একটি মডেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে আয়ের ২৭ শতাংশ বাংলাদেশি পক্ষ পাবে। তবে বেবিচকের অবস্থান, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসায় স্থানীয় মালিকানা দুটি আলাদা বিষয়। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নয়, ব্যবসার মালিকানা এবং দীর্ঘমেয়াদি মুনাফারও অংশীদার করতে হবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেঞ্জিস এভিয়েশন গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট (জিএসই), আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণে ১২ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধনী বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস উইলি জানান, মেঞ্জিস ১ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এসব পদের ৯৯ শতাংশে স্থানীয়দের নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আরও ৪ হাজার ৫০০ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ মেঞ্জিসের ১২ মিলিয়ন ডলারের অঙ্ক ছাড়িয়ে যাবে। সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিংয়ের গ্রুপ সিইও ডেভ উইলিয়াম ডোরনার বলেন, পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎচালিত গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জামে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

টার্মিনাল চালুর সময়সূচি ঠিক রাখতে বিশ্ববাজার থেকে নতুন সরঞ্জাম আসার আগপর্যন্ত নিজস্ব আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাময়িকভাবে যন্ত্রপাতি সরবরাহের সক্ষমতাও রয়েছে কোম্পানিটির। ইন্দোনেশিয়ায় তাদের ১ হাজার কর্মীর ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ স্থানীয়। বাংলাদেশে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সেলেবি।

ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ডোরনার জানান, টার্মিনাল অপারেটর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার এবং নিজস্ব গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেওয়া এয়ারলাইনসগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সেবার মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। ব্যাগেজ সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সীমা না জানালেও নির্ধারিত মান পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি, যাতে দুর্বল সেবার জন্য আর্থিক জরিমানা দিতে না হয়। ডোরনার বলেন, “আমরা যদি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হই, তাহলে আমি মনে করি, থার্ড টার্মিনালে যাত্রীরা আন্তর্জাতিকমানের ও অনেক উন্নত অভিজ্ঞতা পাবেন।”

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সুইসপোর্ট স্থানীয় প্রতিষ্ঠান রিদম গ্রুপের সঙ্গে যৌথ কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিয়েছে। তাদের নির্দিষ্ট বিনিয়োগ ও কর্মীসংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তবে রিদম গ্রুপের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড অপারেটিং ব্যবস্থা চালু রাখা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।

অন্যদিকে, এমিরেটস গ্রুপের অংশ ডনাটা বিশ্বের ৩৫টি দেশের ১৭৪টি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনা করে। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহীরা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তাদের বিনিয়োগ ও কর্মী নিয়োগের বিস্তারিত প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতাবাস সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা, পরিচালন দক্ষতা এবং দ্রুত যাত্রী খালাসে ডনাটার প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের ৯৮ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হলেও এটি ২২ মাস ধরে অব্যবহৃত রয়েছে। সরকার আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন দুটি আগমনী ও দুটি বহির্গমন ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

টার্মিনাল চালু করা এবং দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ দুটি সমান্তরাল হলেও আলাদা প্রক্রিয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের ছয় মাসের মধ্যে নতুন বিদেশি অপারেটর বিমানবন্দরের মোট ট্রাফিকের প্রায় ২৫ শতাংশ সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করবে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নতুন অপারেটরের হাতে দিতে প্রায় এক বছর লাগতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গ্রাউন্ড সার্ভিস চালিয়ে যাবে এবং পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19692 ,   Print Date & Time: Friday, 16 October 2026, 09:18:30 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh