![]()
ইবি রিপোর্ট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে ইরান। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইরানের অভিযোগ, স্টারলিংক শত্রুপক্ষের নির্দেশনা, নিয়ন্ত্রণ, গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সেবাটির টার্মিনাল বন্ধ করা এবং দেশটির সাইবারস্পেসে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খবর আল জাজিরার।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সাইবারস্পেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ আমিন আগামিরি স্টারলিংককে শত্রুদের ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ এটি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করে। স্টারলিংকের স্যাটেলাইট টার্মিনাল বন্ধ করার জন্য আমাদের একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে।’
তবে স্টারলিংক বন্ধ করতে ঠিক কী ধরনের প্রযুক্তি বা যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি আগামিরি। তিনি বলেন, জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় এ ধরনের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিটি ভাগাভাগি করে নেওয়ার বিষয়েও কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত ছিল।
ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার কিংবা এর টার্মিনাল নিজেদের কাছে রাখার জন্য ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যন্ত্র আমদানি ও বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা বা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ যুক্ত হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানভিত্তিক ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ খাতের এক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, স্টারলিংকের সংযোগে বিঘ্ন ঘটাতে ইরানের কর্তৃপক্ষ একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কনফিগারেশনের জ্যামার দিয়ে সেবাটির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা এবং নতুন যন্ত্র স্থাপনের প্রক্রিয়া ধীর করতে জিপিএসের ভুয়া অবস্থানসংকেত ব্যবহার করার বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া স্টারলিংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট প্রোটোকল স্থানীয় অ্যাপ ও সেবার সঙ্গে সংযুক্ত হলে সেগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ। টার্মিনাল জব্দ করতে শারীরিক অভিযানও চালানো হয়। টহল ও ড্রোনের মাধ্যমে তল্লাশির পাশাপাশি যেসব স্থানে এসব যন্ত্র বিক্রি হয়, সেখানেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
গত জুনে ইসরায়েলের রাজনীতিক নাফতালি বেনেট দাবি করেন, ২০২১-২২ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তার জন্য ইরানে হাজার হাজার স্টারলিংক যন্ত্র পাচার করেছিল ইসরায়েল।
স্টারলিংক বন্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তৎপরতা চালাচ্ছে তেহরান। ২০২৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) রেডিও রেগুলেশনস বোর্ডে এ বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে ইরান। স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কটির নিয়ন্ত্রক-সংক্রান্ত নথিপত্রের ক্ষেত্রে নরওয়ের ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে স্টারলিংকের সম্প্রচার বন্ধ করানোর চেষ্টা করছে দেশটি। গত ৪ অক্টোবর তেহরানে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অনুমোদনহীন স্টারলিংক কার্যক্রম বন্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে প্রতিবাদ জানাতে তাঁকে তলব করা হয়।
ইরানের কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। এসব প্ল্যাটফর্ম ‘ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’ বা জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহারে স্তরভিত্তিক প্রবেশাধিকার চালুর ধারণাকেও সমর্থন করছে তারা। এই ব্যবস্থায় বিধিনিষেধের সময় ব্যবসায়ী, গবেষক ও সাংবাদিকদের মতো নির্বাচিত গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে সুরক্ষিত প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সাইবারস্পেস কাউন্সিলের এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ইরানের উপপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোহাম্মদ হাফেজ হাকামি সতর্ক করে বলেন, স্টারলিংকের ব্যাপক বিস্তার দেশটির সাইবারস্পেস নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ‘কফিনে শেষ পেরেক’ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এ সেবার মাধ্যমে ইন্টারনেটে অবাধ প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়।
হাকামি বলেন, ২০১৭-১৮ সালের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভের পর সরকার টেলিগ্রাম বন্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রথমবারের মতো এক সপ্তাহের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। পরে ২০২২-২৩ সালের বিক্ষোভের পর হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় প্রায় পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এ ধারা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী সংকটের সময় আমাদের বিদ্যুৎ বন্ধ করতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার নতুন মাধ্যম হিসেবে স্টারলিংক মৌলিকভাবেই আমাদের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।’
২০২২ সাল থেকে স্টারলিংক ব্যবহার করে ইরানের বিক্ষোভের ভিডিও রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এরপর দেশটিতে হাজার হাজার টার্মিনাল পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
তবে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ঝুঁকি, সীমিত প্রাপ্যতা ও বেশি খরচের কারণে অধিকাংশ ইরানি স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ পান না। তাঁদের নির্ভর করতে হয় দেশের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেটের ওপর, যেখানে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সেবা ও হাজার হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিং খাতের বিধিনিষেধও বৈশ্বিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করছে।
এসব বাধা এড়াতে অনেক ইরানি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ও অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তবে এসব ব্যবস্থায় ইন্টারনেটের গতি কমতে পারে, খরচ বাড়তে পারে এবং অনিরাপদ সংযোগের কারণে ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হলে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, ‘আমাদের তথ্যভান্ডার ও ইন্টারনেটভিত্তিক সেবাগুলোর গুরুত্বের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলো কখনো কখনো ইন্টারনেটের গতি কমাতে বাধ্য হয়। আমরা বিষয়টি অস্বীকার করছি না।’
কর্তৃপক্ষ কিছু প্ল্যাটফর্মের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। গত মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাইবারস্পেসের নীতিমালা ও পরিচালনাব্যবস্থার নথিতে গুগল প্লে ও হোয়াটসঅ্যাপের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চালু করতে হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত শর্ত মানতে হবে। তবে এসব শর্ত মেনে নিতে আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।