• হোম > বাংলাদেশ > নির্মাণকাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয় ৩০ বাংলাদেশিকে

নির্মাণকাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয় ৩০ বাংলাদেশিকে

  • বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৫৩
  • ৩২

---

ইবি রিপোর্ট

বিদেশে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন ৩০ বাংলাদেশি। কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হলেও দেশটিতে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের তুলে দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর হাতে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে। সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাঁদের প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসআরবি জানতে পেরেছে, যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে তাঁদের সামনের দিকে পাঠানো হতো। তাঁদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যাদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছে, আসলে তারা কেউ যুদ্ধের মতো যোগ্য নয়। যুদ্ধের জন্য তাদের ‍শারীরিক, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনো ধরনেরই অনুশীলন ছিল না। তাহলে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণে তাদের কেন পাঠানো হলো? আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য, একধরনের শিকার হিসেবে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন ওই দেশটি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে।’

এসআরবি জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগ—এই তিনটি অংশে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।

জীবিত ব্যক্তিদের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাঁদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান। অন্যদিকে, বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অপর ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন।

মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি ও কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে এসআরবি। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। এ ছাড়া চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টাও করা হচ্ছে।

মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁরা জানতে পেরেছেন, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের মানুষ একইভাবে যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে গেছেন। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুর।

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন তাঁদের পরিবারের অনেকেই স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ দেখা কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছেন না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে সতর্ক থাকা এবং যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19576 ,   Print Date & Time: Wednesday, 14 October 2026, 11:22:19 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh