![]()
ইবি রিপোর্ট
গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে তিন মাসের জন্য দেওয়া এ ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশ। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখা ও এটিএম বুথে স্বাভাবিক লেনদেন চালুর কথা জানিয়েছে ব্যাংকটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকেরা চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছিলেন না। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির চার আমানতকারী আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ব্যাংকটির লেনদেন স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নেয় সরকার।
এর ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ওই বৈঠকে ১৫ অক্টোবর থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদও একই সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমানতকারীদের চাহিদা মেটাতে ন্যাশনাল ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ করা হবে।
তিন মাসের ঋণে ১০ শতাংশ সুদ
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে অর্থ ধার দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থ পরিশোধ করবে।
শর্ত অনুযায়ী, ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ন্যাশনাল ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে না পারলে মেয়াদ শেষের তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে অর্থ ফেরত দেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, তারল্য সহায়তা চেয়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নতুন টাকা ছাপিয়ে সহায়তা না দিয়ে গ্যারান্টির বিপরীতে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার পর তিন মাসের জন্য ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি
এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ ফেরত দিতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দায় মেটাতে হয়। এর ফলে ওই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ হিসেবে রয়েছে।
বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থের পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে সরবরাহ করেছে।
খেলাপি ঋণ ও আর্থিক সংকট
দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত সমস্যার কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক এখনো আর্থিক সংকটে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘদিন সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে গ্রুপটি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়। বর্তমানে মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।
ব্যাংকটি ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর লোকসান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছিল ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।
এ অবস্থায় সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া নতুন ঋণের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন কতটা কার্যকর হয়, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।