![]()
ইবি রিপোর্ট
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অনুমোদনের সময় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর এবং অনুমোদনের সময়সীমা ১৮ মাস থেকে আট মাসে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে সময় আরও কমিয়ে পাঁচ মাসে আনার লক্ষ্য জানিয়েছে সরকার।
গতকাল (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আনা বিয়ার্ডের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এসব প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ) ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে চূড়ান্ত করার বিষয়ে সম্মত হয় দুই পক্ষ।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি নতুন কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি সরকার।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “দুই সংস্থাই ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে শর্ত দিচ্ছে। তাদের শর্তগুলো সমন্বয় করে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।”
অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি মেটানো, জরুরি পণ্য আমদানি, ব্যাংকগুলোর পুনর্মূলধনীকরণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রিফর্ম ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ (আরআরআইপি) কাঠামোর ভিত্তিতে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এতে চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, বাণিজ্য অর্থায়নের মাধ্যমে জ্বালানি ও সারসহ জরুরি পণ্য আমদানি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য সহজীকরণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) বিকাশে সহায়তা করা। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। চতুর্থত, বৈদেশিক অভিঘাত মোকাবিলায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো।
গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক করেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল ব্যাংককে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংকের কাছে আরআরআইপি উপস্থাপন করে। অর্থমন্ত্রী এই অর্থায়ন উদ্যোগকে “বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, উভয় পক্ষের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব ও প্রাথমিক সুপারিশ বিনিময় হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে খেলাপি ঋণ কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়ানো এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ। নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে প্রতিনিধিদল জানিয়েছে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজারের তদারকিতে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে স্বাধীন ও পেশাদার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠনের কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়। নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে এবং নিউইয়র্ক, লন্ডন ও হংকংয়ের ফান্ড ম্যানেজাররা আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ। হংকং ইক্যুইটি ফান্ডের অগ্রগতিও দ্রুত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
কর প্রশাসন সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি নির্ধারণ ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা হয়েছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া এ পদক্ষেপের পাশাপাশি সম্পূর্ণ অটোমেশনের মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।