![]()
ইবি রিপোর্ট
একটি চাকরি বদলে দিতে পারে একজন মানুষের জীবন। সেই আশায় মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন চাকরিপ্রার্থীরা। কিন্তু পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে পৌঁছে যদি জানতে হয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিত, তাহলে প্রস্তুতি, সময় ও অর্থ ব্যয়ের ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব? যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে শুধু নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নয়, দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রার্থীদের আর্থিক ক্ষতি ও ভোগান্তির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা এবং পছন্দের কর্মসংস্থানের সন্ধানে তরুণদের দুর্ভোগ নতুন নয়। বিশের দশকে ইংরেজিতে এমএ পাস করা মেধাবী কবি জীবনানন্দ দাশকেও মনের মতো চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। কলকাতা থেকে বাগেরহাট, দিল্লি থেকে বরিশাল—বিভিন্ন স্থানে চাকরি খুঁজেছেন তিনি, বদলেছেন কর্মস্থলও। চাকরিজীবনের সেই হতাশা থেকেই হয়তো লিখেছিলেন, ‘মানুষেরই হাতে তবু মানুষ হতেছে নাজেহাল; পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।’
সময়ের সঙ্গে চাকরির প্রত্যাশায় পরিবর্তন এলেও নিরাপদ কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা রয়ে গেছে। অনেক চাকরিপ্রার্থীর কাছে সরকারি চাকরি এখন আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের প্রতীক। এ কারণে একটি পদের জন্য বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তাঁদের অনেকে পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ এবং নিজের জীবন বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসেন। কারও কারও জন্য পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাড় করাও কঠিন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিতের খবর জানতে পারেন পরীক্ষার্থীরা। ততক্ষণে অনেকেই কেন্দ্রে পৌঁছে গিয়েছিলেন, এমনকি কারও হাতে ওএমআর শিটও দেওয়া হয়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পরও পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন? প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কোথায় ঘাটতি ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় দুর্বলতা ছিল এবং কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা তদন্তের মাধ্যমে জানা জরুরি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ কেবল একটি পরীক্ষার নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার ব্যবস্থার ওপরও আঘাত হানে। একজন প্রার্থী দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নেন। অন্য কেউ যদি পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকে না। মেধা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশা অটুট রাখতে অভিযোগের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থগিত পরীক্ষার নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ অক্টোবর। অর্থাৎ আগের তারিখের মাত্র ছয় দিন পর আবার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দিক থেকে এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু দূরদূরান্ত থেকে আসা সব প্রার্থীর পক্ষে এত অল্প সময়ের মধ্যে আবার ঢাকায় এসে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও বিবেচনা করা দরকার।
অনেক প্রার্থী হয়তো ধারদেনা করে প্রথমবারের যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাড় করেছিলেন। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় সেই ব্যয় তাঁদের বহন করতে হয়েছে। নতুন তারিখে অংশ নিতে হলে আবারও অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। যাঁদের ঢাকায় থাকার জায়গা নেই, তাঁদের নতুন করে আবাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে। ফলে আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে কোনো প্রার্থী দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলে তাঁর প্রস্তুতি ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে চাকরিপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তা বাড়ে। তাই দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি। যে ঘটনার জন্য প্রার্থীরা দায়ী নন, তার আর্থিক বোঝা কেন তাঁদের বহন করতে হবে—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
১৬ অক্টোবরের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। চাকরিপ্রার্থীরা শুধু নতুন পরীক্ষার তারিখ চান না; তাঁরা চান স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, নিরাপদ পরীক্ষা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার নিশ্চয়তা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের ভোগান্তি বিবেচনায় নেওয়ার মাধ্যমেই সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায় নতুন তারিখে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও চাকরিপ্রার্থীদের মনে থেকে যাবে একই প্রশ্ন—এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?