• হোম > মতামত > ব্যাংক খাতের লুটপাটের দায় জনগণ কেন বহন করবে

ব্যাংক খাতের লুটপাটের দায় জনগণ কেন বহন করবে

  • সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩০
  • ২৫

---

ইবি রিপোর্ট

ব্যাংক খাতে লুটপাট ও অনিয়মের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ধরে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাংক খাতের অর্থ লুটপাটের দায় না থাকা সাধারণ মানুষ কেন করের টাকা দিয়ে এই ক্ষতির বোঝা বহন করবে? অর্থ ব্যয়ের আগে সংস্কার, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ব্যাংক খাতে অনিয়মের দায় থেকে কোনো সরকারই পুরোপুরি মুক্ত নয়। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন অনিয়মের অনুমোদন দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর পরিণতিতে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতের এ অবস্থার দায় নির্ধারণ এবং তা থেকে উত্তরণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ধসে পড়া ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জনগণকে অর্থ দিতে হবে। গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

পাঁচ বছর ধরে এ অর্থ ব্যয় করা হলে মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ কোটি টাকা। আর আট বছর ধরে ব্যয় করলে প্রয়োজন হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতিবছরের এ ব্যয় বাজেটের প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশের সমান।

গভর্নর উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ৬০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বছরে দুই কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া সম্ভব। এ অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতুও নির্মাণ করা যেত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ভিত্তিতে মাথাপিছু এ ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৪৩২ টাকা।

এখন প্রশ্ন হলো, জনগণের করের অর্থ ছাড়া এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ পাওয়া সম্ভব কি না। দাতা সংস্থাগুলো লুটপাটের কারণে সৃষ্ট ব্যাংক খাতের ক্ষতি পূরণে ঋণ দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি রয়েছে, যার আওতায় আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির মতো বিষয় রয়েছে। তবে এই কর্মসূচি সরাসরি ব্যাংক খাতের সামগ্রিক ক্ষতি পূরণের অর্থ নয়।

দাতা সংস্থাগুলো সাধারণত ঋণের সঙ্গে বিভিন্ন শর্ত যুক্ত করে। সে ক্ষেত্রে জনগণের করের অর্থ ব্যাংক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করা হলে একই ধরনের জবাবদিহি ও সংস্কারের শর্ত কেন থাকবে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ মে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে পুরোনো মালিকদের আবার ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বিএনপি সরকার সংসদে যে আইন পাস করে, তাতে নতুন একটি ধারা যুক্ত করে পুরোনো মালিকদের মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়।

সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, নির্দিষ্ট একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে ফেরানোর উদ্দেশ্যে ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। এ নিয়ে সমালোচনা বাড়লে শেষ পর্যন্ত ধারাটি বাতিল করা হয়। দাতা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও আপত্তি তোলা হয়েছিল।

ব্যাংক খাতে পরিবারতন্ত্রের বিস্তারও দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। আগের সরকারের সময়ে বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারকেন্দ্রিক মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতি বদলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক একই পরিবার থেকে পরিচালকসংখ্যা তিনজনের পরিবর্তে দুজন করা এবং একজন পরিচালকের টানা মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ছয় বছর করার প্রস্তাব দিয়েছিল।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) এ দুটি প্রস্তাবই বাতিল করেছে বলে জানা গেছে। বিভাগটির প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন পরিচালকের টানা মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে নয় বছর করা হবে এবং একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার বর্তমান নিয়ম বহাল থাকবে।

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি আর্থিক খাত সংস্কারে কমিশন গঠন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ব্যাংক খাতে সংস্কারের বিষয়ে সরকারের অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হতে পারে।

২০১৯ সালে আইএমএফের তৈরি ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আর্থিক খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আপত্তির কারণে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে আইএমএফ বলেছিল, ‘সমাজের একটি অংশের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা রয়েছে। কিছু প্রভাবশালী ও ধনী ব্যবসায়ীরা বুঝে গেছেন যে তাঁদের ঋণ পরিশোধে বাধ্য করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা দেশে নেই। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। পরিস্থিতি এমনই যে মাত্র তিনজন বড় ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলেই একটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।’

এ ধরনের পরিস্থিতি আবার ফিরে এলে ব্যাংক খাতে জনগণের অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ঋণ আদায় এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে দেশের ভেতরে রয়েছে ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ। বিদেশে থাকা সম্পদের মূল্য ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা।

বিদেশে থাকা সম্পদ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নানা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তবে দেশের অভ্যন্তরে থাকা সম্পদ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা নয়, সম্পদ উদ্ধার, অর্থ ফেরত আনা এবং ব্যাংক খাতে তা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তার দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করেছে। এ উদ্যোগের ফলাফল ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। তবে কেবল ব্যাংক একীভূত করলেই খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান হবে না।

১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়া ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছিল। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য দানাহার্তা, ব্যাংকে মূলধন জোগানোর জন্য দানামোদাল এবং বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের দেনা পুনর্গঠনের জন্য করপোরেট ঋণ পুনর্গঠন কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে ৫১টি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে ১০টি ব্যাংকিং গ্রুপে আনা হয়েছিল।

দক্ষিণ কোরিয়াও সংকটের সময় কয়েকটি অদক্ষ ব্যাংক বন্ধ করে দেয়। খেলাপি ঋণ কিনে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে। আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সরকার সাময়িকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের নিশ্চয়তা দিয়েছিল।

অন্যদিকে, ১৯৯০-এর দশকের ব্যাংক সংকট মোকাবিলায় সুইডেন বিশেষ ব্যাংক সহায়তা কর্তৃপক্ষ গঠন করে। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা যাচাই করে যেগুলোকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, সেগুলোতে মূলধন জোগানো হয়। যেগুলোকে বাঁচানো সম্ভব ছিল না, সেগুলো সরকার নিয়ন্ত্রণে নেয়। খেলাপি সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘সেকুরাম’ ও ‘রেত্রিভা’ নামে পৃথক প্রতিষ্ঠানও গঠন করা হয়েছিল। ব্যাংক খাতের অবস্থা ও সরকারি সহায়তার তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও ছিল।

ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে অর্থের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই অর্থের জোগান সাধারণ মানুষকে দিতে হলে এর বিনিময়ে কী পরিবর্তন আসবে, তা পরিষ্কার করা দরকার। ঋণ আদায়, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার, ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা, পরিবারতন্ত্রের অবসান এবং অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যেমন শর্ত ও অগ্রগতির হিসাব দিতে হয়, তেমনি জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের সংকট তৈরিতে যাঁদের ভূমিকা ছিল, তাঁদের দায় নির্ধারণ এবং অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।

সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার আগে সরকারকে জানাতে হবে, এই ব্যয়ের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে কী ধরনের সংস্কার হবে, কতটা অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের লুটপাট ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা না হলে জনগণের অর্থ ব্যয় করে সাময়িকভাবে ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দেওয়া গেলেও সংকটের মূল কারণগুলো থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19376 ,   Print Date & Time: Monday, 12 October 2026, 08:40:43 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh