• হোম > অর্থনীতি | বাংলাদেশ > বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে টানা দুই প্রান্তিকে

বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে টানা দুই প্রান্তিকে

  • সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৫
  • ১৬

---

ইবি রিপোর্ট

বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমেছে। এর মধ্য দিয়ে টানা দুই প্রান্তিকে নতুন বিনিয়োগ হ্রাস পেল। অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক ঋণমানের অবনমন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বিপুল খেলাপি ঋণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। তবে দেশে আগে থেকে কার্যক্রম চালানো বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বাড়ায় বার্ষিক হিসাবে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর আগে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো কয়েক দফায় বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে। কোনো দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি নির্ধারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট দেশের ঋণমান বিবেচনায় নেন। পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতে বিপুল খেলাপি ঋণও বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এসব কারণে নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে তাঁদের আগ্রহ কমছে।

নতুন বিনিয়োগ কমলেও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। নতুন বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ মিলিয়ে এ সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।

তবে আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুন সময়ে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, বার্ষিক হিসাবে বৃদ্ধি দেখা গেলেও প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবে বিনিয়োগের প্রবাহে নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে।

মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল আগে থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়ে ২৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা বলতে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার যে অংশ দেশে রেখে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়, তাকে বোঝায়। এ অর্থ মোট বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ালেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশে আসছেন, এমনটি বোঝায় না।

আলোচ্য প্রান্তিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বাবদ মোট ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেশে এসেছে। একই সময়ে এ খাতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে এ হিসাব অনুযায়ী নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের তিনটি উপাদানের মধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ এসেছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, এক প্রান্তিকের ব্যবধানে নিট ঋণ কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।

গত বছরের একই প্রান্তিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

এ সময়ে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বাবদ মোট ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে এ খাত থেকে নিট বিদেশি বিনিয়োগে যোগ হয়েছে মাত্র ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। চলতি বছরের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে আসে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার হার ১০ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান সংকট এবং অর্থনীতির অন্যান্য দুর্বলতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমানের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি+’ অপরিবর্তিত রাখলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।

সব মিলিয়ে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও ঋণমান নিয়ে উদ্বেগ বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে। দেশে আগে থেকে থাকা বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ালেও নতুন বিনিয়োগের প্রবাহে ধারাবাহিক পতন আলাদা করে নজর কাড়ছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19370 ,   Print Date & Time: Monday, 12 October 2026, 08:20:30 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh