![]()
ইবি রিপোর্ট
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, অপরাধের সংজ্ঞায় অস্পষ্টতা এবং আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকলে সরকারবিরোধী বক্তব্য, সংবাদ প্রকাশ কিংবা অনলাইন মতামতের কারণে সাধারণ মানুষও আইনি হয়রানির মুখে পড়তে পারেন।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী—বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন বক্তারা। সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি, এনসিপি আয়োজিত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস।
আলোচনায় অংশ নেন এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার, ডেইলি ওয়াদার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, লেখক ও নাটশেল টুডের নির্বাহী সম্পাদক অপূর্ব জাহাঙ্গীর এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা। সভা সঞ্চালনা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হোসাইন।
আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগে অসংখ্য মানুষ গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ মানুষও এর বাইরে ছিলেন না। লেখক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও ওই আইনের অপপ্রয়োগের ভয়াবহতা তুলে ধরে।
তাঁর ভাষ্য, সেই অভিজ্ঞতা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিল, যাতে অনলাইন অপরাধ দমনের পাশাপাশি নাগরিকদের অযাচিত গ্রেপ্তার ও হয়রানির সুযোগ সীমিত থাকে। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অপরাধের সংজ্ঞা আরও ব্যাপক ও অস্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আখতার হোসেনের দাবি, সরকার-সমর্থকদের গালিগালাজ, গুজব ছড়ানো ও মানহানিকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অথচ সরকারের সমালোচনা করলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী কিংবা সাধারণ মানুষকে আইনের আওতায় আনার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এভাবে অস্পষ্ট বিধান ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে।
দেশে চাঁদাবাজি, লুটপাট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হওয়ার অভিযোগ করে আখতার বলেন, এলপিজি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির পেছনে সিন্ডিকেটের ভূমিকা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, অনলাইনে উসকানি, সহিংসতার আহ্বান, নারী ও শিশুর প্রতি হয়রানি এবং অপতথ্য ছড়ানোর মতো ঘটনা উদ্বেগজনক। তবে এসব কর্মকাণ্ডের অনেকগুলোই বিদ্যমান আইনেও অপরাধ। তাই নতুন সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা দরকার।
তিনি বলেন, গুজবের সংজ্ঞা অস্পষ্ট থাকলে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কোন তথ্য গুজব হিসেবে বিবেচিত হবে, কে তা যাচাই করবে এবং যাচাইয়ের পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন। স্বাধীন তদন্তের সুযোগ না থাকলে অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি বা পরিবারও হয়রানির শিকার হতে পারেন। একই সঙ্গে জনস্বার্থে সত্য তথ্য প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রাখার ওপর জোর দেন তিনি।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর কিছু বিধান অস্পষ্ট থাকায় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ২৬(ক) ধারার প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, কেউ আন্তরিকভাবে প্রচারিত একটি তথ্যের ভিত্তিতে কারও মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করে ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়ে তাঁর জন্য দোয়া করলে, সেই ব্যক্তিও কি শাস্তির আওতায় আসবেন?
মঞ্জুর মতে, অপরাধের সংজ্ঞা ও প্রয়োগের সীমা নির্দিষ্ট না থাকলে সাধারণ মানুষও হয়রানির মুখে পড়তে পারেন। বিএনপিকে সতর্ক করে তিনি বলেন, অতীতে ক্ষমতায় থাকার সময় গঠিত আইন ও বাহিনী পরবর্তী সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে। তাই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এড়িয়ে আইনের অপপ্রয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা করা দরকার।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি অপ্রয়োজনীয় বলে দাবি করা হলেও বর্তমান সরকার কয়েকটি অধ্যাদেশ প্রায় অবিকল রেখে আইন করেছে। স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত আইনে নির্বাহী আদেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের ক্ষমতা রাখা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সারোয়ার তুষারের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সাইবার অধ্যাদেশে অনলাইন যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতায় উসকানির বিষয়গুলো নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনী ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর ফেসবুক পোস্টের কারণে ২১ থেকে ২২ জনকে গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলো বিদ্যমান সাইবার আইনের আওতায় না পড়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানি, অপমান ও গুজবের সংজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সারোয়ার।
নাটশেল টুডের নির্বাহী সম্পাদক অপূর্ব জাহাঙ্গীর বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনী যেভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তাতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে অহমিকার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আইনটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি আমলাতান্ত্রিক নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—সেসব বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের সংজ্ঞা নির্ধারণে সরকার, আদালত নাকি তৃতীয় কোনো পক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অপূর্ব জাহাঙ্গীর। তবে আইনটি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি সংশোধনীর ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো পুনর্বিবেচনার প্রত্যাশা জানান।
ডেইলি ওয়াদার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর ২৫ ও ২৬ ধারাসহ কয়েকটি বিধান বাক্স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক। সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাইপ্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা সাংবাদিকদের সম্পাদকীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ফয়সাল মাহমুদের আশঙ্কা, সরকারি নিশ্চিতকরণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করলে মামলা বা হয়রানির ভয়ে সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকেরা সাংবাদিকদের ওপর চাপ দিতে পারেন। এতে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আইনের নাম বদলালেও অপব্যবহারের আশঙ্কা দূর হয়নি।
তাঁর মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর বাধাগ্রস্ত হবে না। কিন্তু গুজবের অস্পষ্ট সংজ্ঞা, মিম তৈরি ও শেয়ার করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ এবং মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রাখার প্রস্তাব নতুন করে দমন-পীড়নের আশঙ্কা তৈরি করছে।
আলোচনা সভার সঞ্চালক অ্যাডভোকেট আরমান হোসাইন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল, কোনো সরকার আইন ব্যবহার করে বাক্স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও চিন্তার প্রকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত বিধান ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। ওই আইনের মাধ্যমে লেখক ও মতপ্রকাশকারীদের গ্রেপ্তার, কারাগারে নির্যাতন এবং হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তাদের অভিমত, অনলাইন অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও প্রস্তাবিত আইনের সংজ্ঞা, যাচাইপ্রক্রিয়া ও প্রয়োগের সীমা নির্দিষ্ট করা জরুরি। তাঁদের দাবি, নাগরিক অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রেখে সংশোধনী প্রণয়ন করতে হবে, যাতে আইনটি হয়রানি বা মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।