![]()
ইবি রিপোর্ট
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নির্ধারিত বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তার কঠোর বলয়ে ঢেকে গেছে রাজধানী দিল্লি। শনিবার (১০ অক্টোবর) ককরোচ জনতা পার্টি, সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের ডাকা কর্মসূচি ঠেকাতে ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল এবং মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করা হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকেই শহরে প্রায় ৩০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে শনিবারের সমাবেশ নিষিদ্ধের কথা জানান। পাশাপাশি দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
রাজধানীতে নেওয়া বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘একটি মাছি মারতে আপনি হাতুড়ি ব্যবহার করতে পারেন না।’
এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগসংবলিত স্মারকলিপি দেন। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানান, আগামী সোমবার ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছেও একই ধরনের স্মারকলিপি জমা দেওয়া হবে।
বিক্ষোভের আগে দিল্লির সীমান্তবর্তী নয়ডা, ফরিদাবাদ ও গুরুগ্রামের বিভিন্ন সড়কে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসিয়েছে পুলিশ। যানবাহনে তল্লাশির পাশাপাশি তরুণ যাত্রীদের এবং তাদের কাছে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার বা পোস্টার আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
যানজটের আশঙ্কায় শুক্রবার ও শনিবার নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসা-যাওয়ার কথা থাকা অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল করেছে উত্তর রেলওয়ে। বাতিল ট্রেনগুলোর মধ্যে ৭৫টি মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন রয়েছে। তালিকায় শতাব্দী, রাজধানী, হামসফর ও তেজস এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনও রয়েছে।
দিল্লি পুলিশের অনুরোধে মেট্রো কর্তৃপক্ষ শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখে। একই সঙ্গে শুক্রবার রাত ১০টা থেকে মধ্য দিল্লির একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করা হয়। বিশেষ শাখার উপপুলিশ কমিশনার মনীষী চন্দ্র জানান, জনপথ ও কর্তব্য পথের সংযোগস্থল থেকে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে এ বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে।
কনট প্লেস এলাকার দোকানপাট, কার্যালয় ও রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে নয়াদিল্লি ব্যবসায়ী সমিতি। শহরের মদের দোকান বন্ধের পাশাপাশি স্কুল-কলেজে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছে। পাটিয়ালা হাউস ও রাউস অ্যাভিনিউ আদালত শুধু ভার্চুয়ালি বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দিল্লির বাইরের শিক্ষার্থী বা তরুণদের স্থানীয় আবাসিক হোটেলে কক্ষ ভাড়া না দিতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি গ্রীষ্মে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট-ইউজি) প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিতে পুলিশের কিছু ‘গুরুতর ত্রুটি’ ধরা পড়েছিল। ওই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার সময় আমরা বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারিনি এবং একই স্থানে একাধিক ইউনিটের পুলিশ মোতায়েন করেছিলাম। এবার প্রতিটি নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্ব নির্দিষ্ট ইউনিটকে দেওয়া হয়েছে।’
নতুন পরিকল্পনায় নয়াদিল্লি জেলার ৩৭টি পয়েন্টে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। ১৫টি জেলায় থানা ভবন, রাজীব গান্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ছত্রশাল স্টেডিয়াম ও যমুনা ক্রীড়া কমপ্লেক্সসহ প্রায় ৩০টি অস্থায়ী আটককেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে প্রায় ৬০০টি নিচু মেঝের বাসও রাখা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের ৮ থেকে ১৫ হাজার সদস্যের পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে আনা কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১টি কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে। এসব কোম্পানিতে সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৩ হাজার; এর মধ্যে নারীদের পাঁচটি কোম্পানিও রয়েছে।
আম আদমি পার্টি ও বামপন্থী দলগুলোর অভিযোগ, দিল্লির কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া ঠেকাতে বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী নেতাকর্মীদের বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। গুজরাটে কয়েকজন কর্মীকে আটক করে দিল্লিতে না যাওয়ার লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের ইতারসি স্টেশনে শিক্ষার্থীদের ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ককরোচ জনতা পার্টি কর্মসূচি পালনে অনড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দলটি লিখেছে, ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে নিয়ে মোদি সরকার এতটাই ভীত যে তারা এমন সব ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা এমনকি জরুরি অবস্থার সময়ও নেওয়া হয়নি। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তারা জাতীয় রাজধানীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলতে চাইছে।’
অন্যদিকে, দলের নেতা সৌরভ দাসকে পাঠানো চিঠিতে নয়াদিল্লি জেলার উপপুলিশ কমিশনার শচীন শর্মা জানান, সাধারণ নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার, তীব্র যানজট এবং সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় সমাবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করেছে হরিয়ানার গুরুগ্রাম পুলিশ। হিন্দুস্তান টাইমসকে পুলিশ জানায়, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ঠেকাতে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার সোসাইটিতে রাঠির বাসভবনে যায় পুলিশের একটি দল। দিল্লিতে না যাওয়ার নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে আটক করা হয়।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে প্রতিবাদ জানাতে দলের সদস্যরা ‘জেলে যেতেও প্রস্তুত’। কারাবাসের হুমকি দিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হতেও প্রস্তুত রয়েছেন।