![]()
ইবি রিপোর্ট
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এখনো বাস্তব রূপ পায়নি। ৩৩ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) অবকাঠামো নির্মাণের ধীরগতি, জমি হস্তান্তরের জটিলতা, ইউটিলিটি সেবার ঘাটতি এবং শ্রমিকদের আবাসনসংকট শিল্পায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ অঞ্চলে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। আরও ১৫টি প্রতিষ্ঠানের কারখানা নির্মাণাধীন। ৫ হাজার ৫০০ একর জমি উন্নয়ন করে ১৩৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশীয় বিনিয়োগ এসেছে ১২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮ হাজার মানুষের।
রপ্তানি আয়ও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। এখন পর্যন্ত কারখানাগুলো থেকে ৪ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার কোটি ডলারের রপ্তানি অর্জনের পরিকল্পনা ছিল। ২০২৬ সালের মধ্যে ৫৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও ২ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও পূরণ হয়নি।
বিজিএমইএকে প্রায় ৫০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও কিছু অংশের সীমানা নির্ধারণ ও আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর এখনো বাকি। সংগঠনটির সাবেক সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগকারীরা জমির মূল্য পরিশোধ ও শর্ত পূরণ করেও অপেক্ষায় রয়েছেন। প্লট হস্তান্তর, সড়ক নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে তাঁরা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা মডার্ন সিনটেক্সের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক সফল বড়ুয়া জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস ছাড়া বড় শিল্পপ্রকল্প লাভজনকভাবে চালানো কঠিন। অনেক কারখানা এখনো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।
বেজা জানিয়েছে, পরিকল্পিত ৩৮টি পানির পাম্প হাউসের মধ্যে ১৫টি চালু হয়েছে। একটি পানি শোধনাগারের প্রথম ধাপ ২০২৭ সালের মার্চে শেষ হওয়ার কথা; এতে দৈনিক ৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ সম্ভব হবে। দ্বিতীয় ধাপে সক্ষমতা আরও ৫ কোটি লিটার বাড়বে। বিদ্যুৎ গ্রিডের ট্রান্সফরমার সক্ষমতা ২ হাজার ২৮০ এমভিএ। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার সংযুক্ত লোড প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট, সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৬০ মেগাওয়াট। তিনটি স্টেশনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
প্রধান মহাসড়ক থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরের এ অঞ্চলে কর্মী নিয়োগ ও পণ্য পরিবহনেও সমস্যা রয়েছে। প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের কর্মকর্তা এহসানুল কবির নিজামী বলেন, রাতের বেলায় এলাকা নির্জন ও অন্ধকার থাকায় শ্রমিকেরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা ও ট্রেড লাইসেন্সের অনুমোদন পেতেও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
বেজার ওয়ান-স্টপ সার্ভিস পোর্টালে ৬২ ধরনের সেবা অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। এনবিআরের ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে সমন্বয় প্রায় শেষ পর্যায়ে; পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ চলছে। সাব-জোন ১৮-তে স্বল্প খরচে শ্রমিক আবাসন নির্মাণও চলছে। দক্ষতা উন্নয়ন ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের কাজ ৮৭ শতাংশ, পরিবেশগত পরীক্ষাগারের ৯৪ শতাংশ এবং জরুরি সাড়াদান কেন্দ্রের কাজ ৭২ শতাংশ শেষ হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও শ্রমিকদের আবাসন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে। এনএসইজেডের সাবেক পরামর্শক আবদুল কাদের খান মনে করেন, প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত হলে সরাসরি সর্বোচ্চ ১৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, প্রকল্পটির প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান কমানো এখনো চ্যালেঞ্জ। জাতীয় জ্বালানিসংকট তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা করতে হবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতির আশা প্রকাশ করেন তিনি। নজরদারির জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনায় অগ্রগতি না হওয়ায় বিদ্যমান ভবন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।