![]()
রয়টার্স
জার্মানির শিল্পখাত যখন প্রতিযোগিতা ও কর্মসংস্থান সংকটে পড়েছে, তখন দেশটিতে নতুন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠায় রেকর্ড হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩ হাজারের বেশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৮ শতাংশ বেশি। নতুন এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক ব্যবসা নিয়ে কাজ করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলধনের সহজলভ্যতা, এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার এবং শ্রমবাজারের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে জার্মানিতে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
জার্মান স্টার্টআপ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ভেরেনা পাউসডার বলেন, দেশের বড় অংশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে, তখন নতুন উদ্যোক্তাদের এই গতি সময়োপযোগী।
জার্মান অর্থনীতির দীর্ঘদিনের ভিত্তি শিল্পখাত। কিন্তু চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির শিল্পখাতে প্রায় ৪ লাখ চাকরি কমেছে বলে জার্মান ইকোনমিক ইনস্টিটিউটের এক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগেন ও মার্সিডিজ এবং ভারী শিল্পের প্রতিষ্ঠান থাইসেনক্রুপও এই চাপের মুখে পড়েছে। শিল্পখাতের এই সংকট নতুন স্টার্টআপের জন্য বাজার তৈরি করছে। বিশেষ করে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি করা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় কোম্পানির ব্যয় কমানো, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ সম্পন্ন করা এবং পুরোনো ব্যবসায়িক ব্যবস্থাকে আধুনিক করার সুযোগ তৈরি করছে।
বার্লিনভিত্তিক এআই সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ল্যাংডকের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হেনড্রিক হফস্টাড বলেন, জার্মানির অনেক পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে এখন নিজেদের নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। ফলে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজার তৈরি হয়েছে।
মাত্র তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ল্যাংডকে এখন প্রায় ৬০ কর্মী কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জার্মানির নতুন স্টার্টআপগুলোর বড় অংশ প্রযুক্তিনির্ভর হলেও ব্যবসার পরিসর শুধু এআইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির মধ্যে সফটওয়্যার খাতের অংশ ২৮ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা খাতের অংশ ৯ শতাংশ এবং খাদ্য খাতের ৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের এমনই একটি প্রতিষ্ঠান মেনস্ট্রুফ্লো। ২০২৩ সালে পলিনা সার্গেইভা প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। মাসিকের সময় ব্যথা কমাতে বৈদ্যুতিক স্নায়ু উদ্দীপনা প্রযুক্তিনির্ভর একটি যন্ত্র তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে বলে সার্গেইভা জানান।
এদিকে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা শুধু প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানে কাজ করা পলিনা লুটজ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পোশাকের ব্র্যান্ড নাইটি বার্লিন চালু করেন। শুরুতে অনলাইনে বিক্রি করলেও পরে প্রতিষ্ঠানটি পপ-আপ স্টোরে বিক্রি শুরু করেছে।
স্টার্টআপ খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধিও নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় গতি দিচ্ছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জার্মান স্টার্টআপগুলো প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংগ্রহ করেছে। এই অর্থের পরিমাণ পুরো ২০২৫ সালের তুলনায় বেশি বলে জার্মান স্টার্টআপ অ্যাসোসিয়েশনের স্টার্টআপ মনিটরে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এআই খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জার্মানি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জার্মান এআই স্টার্টআপগুলো ৫.৭ বিলিয়ন ইউরো পেয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩০৮ বিলিয়ন ইউরো।
স্টার্টআপ খাতকে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে জার্মান সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির মন্ত্রিসভা জুলাইয়ে নতুন ‘স্টার্টআপ অ্যান্ড স্কেলআপ স্ট্র্যাটেজি’ অনুমোদন করে। এতে ব্যবসা শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তার জন্য ১৫২টি পদক্ষেপ রাখা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। প্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আইফো ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান টিমো ভলমারশয়ুসার বলেন, জার্মানিতে তৈরি নতুন কোম্পানিগুলো দ্রুত অর্থায়নের জন্য অন্য দেশে চলে গেলে দেশটির উদ্ভাবন থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যও অন্য দেশে চলে যেতে পারে।
অর্থাৎ শিল্পখাতের সংকট একদিকে জার্মান অর্থনীতির জন্য চাপ তৈরি করলেও অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে। এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই উদ্যোক্তাদের দেশে ধরে রাখা এবং তাদের ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা।