• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > ১৩৫ টাকার ডিজেলে শুল্ক-কর ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা

১৩৫ টাকার ডিজেলে শুল্ক-কর ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা

  • বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৫০
  • ৯

---

ইবি রিপোর্ট

ডিজেলের বর্তমান খুচরা মূল্যের বড় একটি অংশ যাচ্ছে শুল্ক ও কর হিসেবে। প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা দামের ডিজেলে সরকার শুল্ক-কর বাবদ নিচ্ছে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা। এতে রাজস্ব বাড়লেও পরিবহন, সেচ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক-করের বর্তমান কাঠামো চালু হয় ২০২৫ সালের জুনে। ওই সময় নির্দিষ্ট ‘ট্যারিফ ভ্যালু’ভিত্তিক কর ব্যবস্থার পরিবর্তে পরিবর্তনশীল ‘ইনভয়েস ভ্যালু’ ব্যবস্থা চালু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

আগের ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করলেও লিটারপ্রতি মোট শুল্ক-কর সর্বোচ্চ ১৬ টাকা ৭৬ পয়সায় সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানি করা তেলের ইনভয়েস মূল্যের ওপর মোট ২৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ আগাম কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে লিটারপ্রতি সরকারের কর আদায়ের পরিমাণও বাড়ে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতির তুলনায় সরকার প্রতি লিটারে ১৯ টাকা ৬ পয়সা বেশি কর আদায় করছে।

মূল্যস্ফীতিতে জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব

জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব পরিবহন, সেচ ও শিল্প উৎপাদনের খরচে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এসব ব্যয়ের প্রভাব পণ্য ও সেবার দামে যুক্ত হয়। এতে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ব্যবসায়ীরাও বাড়তি ব্যয়ের চাপের কথা জানিয়েছেন। রেস্তোরাঁ মালিকদের ভাষ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার সুযোগ কমেছে। একই সময়ে বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় মেন্যুর দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জমে থাকা লোকসান সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বাড়লে, তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলছে।”

তিনি সরকারের অতিরিক্ত শুল্ক-করের পুরো চাপ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ছে কি না, তা পুনর্বিবেচনার তাগিদ দেন। ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হলে সর্বজনীন ব্যবস্থার পরিবর্তে নিম্নআয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির পরামর্শ দেন তিনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতার সময় অনেক দেশই অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে জ্বালানির ওপর কর কমায়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার সংকটকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মোট কর আদায় সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।”

শুল্ক-কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব বিপিসির

ইনভয়েস ভ্যালুভিত্তিক বর্তমান কর কাঠামোর কারণে বিপিসির ওপরও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ১৩৫ টাকা খুচরা মূল্যের এক লিটার ডিজেল থেকে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক-কর হিসেবে চলে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় মেটাতে বিপিসির নিজস্ব রাজস্ব সংস্থানের সুযোগ কমেছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিপিসি ইনভয়েস ভ্যালুতে শুল্ক-কর কমানো অথবা আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করে।

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার প্রধান পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে পাশ্ববর্তী দেশে তেল পাচার রোধ এবং বিপিসির লোকসান কমানোর যুক্তি দেওয়া হয়।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে বিপিসি ২২ হাজার ৮৭৫ দশমিক ৬৬ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের মুখে পড়ে।

ডলারের বিনিময় হারও বিপিসির ব্যয় বাড়িয়েছে। ২০২১ সালে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থাকলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের ল্যান্ডিং কস্টে প্রায় ৫৫ টাকা যোগ হয়েছে। জরুরি আমদানি ব্যয় মেটাতে বিপিসি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়।

জরুরি ঋণে সাময়িক স্বস্তি

গত ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার বিপিসিকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তা দেয়। অর্থ বিভাগ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে এবং ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ হিসেবে দেওয়া এই অর্থে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসির তেলের আমদানি দরপত্র কভার করা সম্ভব হবে।

বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাড়তি শুল্ক-করের কারণে জ্বালানি বিক্রির অর্থ থেকে বিপিসির অংশ কমে গেছে। আগের ট্যারিফ ভ্যালুতে কর আদায় হলে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির হাতে ১৯ টাকা ৬ পয়সা বেশি থাকত। এতে লোকসান ও আমদানি ব্যয়ের ঘাটতি কমানো সম্ভব হতো।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, শুল্ক সংক্রান্ত প্রস্তাব কমিটির ওয়ার্কিং পেপারে জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে জরুরি ঋণের সুবিধা পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।

বিপিসির প্রস্তাবে দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতীয় ‘জ্বালানি স্থিতিশীলতা তহবিল’ গঠন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত চালু এবং জাতীয় জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার কথাও ছিল।

সরকারের দেওয়া অর্থে বিপিসির তাৎক্ষণিক নগদ সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও শুল্ক-কাঠামো ও জ্বালানি ব্যয়ের মূল চাপ এখনো রয়ে গেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19138 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 10:34:22 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh