• হোম > অর্থনীতি > বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির নাজুক চিত্র

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির নাজুক চিত্র

  • বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৩
  • ১৫

---

 

ইবি রিপোর্ট

বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশ কয়েকটি প্রধান সূচকে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে। কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সংকোচন, জ্বালানি ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আদায়ে ধীরগতির কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ, উদার ও ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বিনিয়োগ কমে যাওয়াকেই প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করেছে। কোথাও কর্মঘণ্টা কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রেখে কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে।

শিল্প খাতেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। ওই অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন কমেছে ০ দশমিক ৩ শতাংশ। গ্যাসের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

অন্যদিকে দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগের জায়গায় রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজস্ব আদায়েও দুর্বলতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। এতে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে এবং নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়েছেন। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, নীতি সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ব্যবসার খরচ কমানো, প্রশাসনিক সংস্কার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

আমেরিকান চেম্বার অ্যামচেমের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদও আইন-শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে অর্থনীতির এই চাপের মধ্যেও রেমিট্যান্স কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অর্থ বিনিয়োগে ব্যবহার করা গেলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো সামনে এসেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19126 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 10:12:50 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh