• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | বাংলাদেশ > ডিজেলের প্রতি লিটারে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক নিচ্ছে সরকার

ডিজেলের প্রতি লিটারে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক নিচ্ছে সরকার

  • বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩১
  • ৩২

---

ইবি রিপোর্ট

জ্বালানি তেলের দামে একদিকে বাড়তি করের চাপ, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ও বিপিসির লোকসান—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাত। ১৩৫ টাকা দামের প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার শুল্ক ও কর বাবদ নিচ্ছে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে জ্বালানি করও বাড়তে থাকায় এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন, সেচ, শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের ব্যয়ে।

জ্বালানির ওপর এই বাড়তি শুল্কের কাঠামো কার্যকর হয় ২০২৫ সালের জুন থেকে। সে সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট ‘ট্যারিফ ভ্যালু’ ভিত্তিক কর ব্যবস্থার পরিবর্তে পরিবর্তনশীল ‘ইনভয়েস ভ্যালু’ পদ্ধতি চালু করে।

আগের ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমবেশি হলেও লিটারপ্রতি মোট শুল্ক-কর সর্বোচ্চ ১৬ টাকা ৭৬ পয়সায় সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান পদ্ধতিতে আমদানি করা তেলের ইনভয়েস মূল্যের ওপর মোট ২৫ শতাংশ কর নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ আগাম কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর।

এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে সরকারের লিটারপ্রতি কর আদায়ও বাড়ে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, আগের ট্যারিফ পদ্ধতির তুলনায় সরকার এখন প্রতি লিটারে ১৯ টাকা ৬ পয়সা বেশি কর আদায় করছে।

জ্বালানির খুচরা মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে এই বাড়তি কর যুক্ত হওয়ায় পরিবহন, সেচ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্য ও সেবার দামে। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। সেচ, পরিবহন ও পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়ে। এতে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ে।

রেস্তোরাঁ মালিকরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, জ্বালানি ও উপকরণের দাম বাড়ায় তাদের মুনাফার সুযোগ কমেছে। আবার বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় মেন্যুর দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপানোও তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে হবে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জমে থাকা লোকসান সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বাড়লে, তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলছে।”

সরকার বাড়তি শুল্ক-করের পুরো চাপ সাধারণ ভোক্তাদের ওপর দিচ্ছে কি না, তা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন তিনি। ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হলে সর্বজনীন ভর্তুকির বদলে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির কথা বলেন এই অর্থনীতিবিদ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতার সময় অনেক দেশই অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে জ্বালানির ওপর কর কমায়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার সংকটকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মোট কর আদায় সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।”

ইনভয়েস ভ্যালু পদ্ধতিতে কর আদায়ের কারণে বিপিসির আর্থিক চাপও বেড়েছে। ১৩৫ টাকা খুচরা মূল্যের ডিজেল থেকে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা কর হিসেবে চলে যাওয়ায় তেলের আমদানি ব্যয় মেটাতে বিপিসির নিজস্ব রাজস্ব ব্যবহারের সুযোগ কমেছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিপিসি ইনভয়েস ভ্যালুতে শুল্ক-কর কমানো অথবা আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতিতে ফেরার সুপারিশ করে।

এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর সরকার সব ধরনের প্রধান পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৭.৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। পাশ্ববর্তী দেশে তেল পাচার ঠেকানো এবং বিপিসির লোকসান কমানোর কথা জানানো হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে বিপিসি ২২ হাজার ৮৭৫.৬৬ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের মুখে পড়ে।

এর সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়নও বিপিসির ব্যয় বাড়িয়েছে। ২০২১ সালে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থাকলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের ল্যান্ডিং কস্টে প্রায় ৫৫ টাকা যোগ হয়েছে। আমদানির বিল পরিশোধে বিপিসি তাদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল থেকে ১৯,৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়।

শুল্ক সংস্কারের প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল জ্বালানি বিক্রি থেকে বিপিসির নিজস্ব আয়ের অংশ বাড়ানো। তবে গত ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার ৪,৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পর এ বিষয়ে বিপিসির তৎপরতা সাময়িকভাবে কমেছে।

অর্থ বিভাগ থেকে ৫ বছর মেয়াদি এবং ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ হিসেবে দেওয়া এই অর্থ দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসির তেলের আমদানি দরপত্র কভার করা সম্ভব হবে।

বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাড়তি শুল্ক-করের কারণে জ্বালানি বিক্রির অর্থ থেকে বিপিসির অংশ কমেছে। বর্তমান ইনভয়েস ভ্যালু ব্যবস্থায় ১৩৫ টাকা দামের ডিজেল থেকে সরকারকে ৩৫.৮২ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। আগের ট্যারিফ ভ্যালু ব্যবস্থায় দিতে হতো ১৬.৭৬ টাকা। ফলে আগের পদ্ধতি থাকলে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির হাতে ১৯ টাকা ৬ পয়সা বেশি থাকত। এতে লোকসান ও আমদানি ব্যয়ের ঘাটতি কমানো সম্ভব হতো।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, শুল্ক সংক্রান্ত প্রস্তাব কমিটির ওয়ার্কিং পেপারে দেওয়া হলেও জরুরি ঋণের সুবিধা পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।

বিপিসির দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবে জাতীয় ‘জ্বালানি স্থিতিশীলতা তহবিল’ গঠন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত চালু এবং জাতীয় জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার কথা রয়েছে।

সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তায় বিপিসি আপাতত আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলানোর সময় পেলেও শুল্ক কাঠামোর মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় জ্বালানির দামের সঙ্গে সরকারের কর আদায় বাড়ছে, যার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19100 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 08:11:23 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh