• হোম > জাতীয় | দেশজুড়ে > হকারমুক্ত ফুটপাত, নির্বিঘ্ন চলাচলে স্বস্তি মিরপুরবাসীর

হকারমুক্ত ফুটপাত, নির্বিঘ্ন চলাচলে স্বস্তি মিরপুরবাসীর

  • বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৮
  • ২৮

---

ইবি রিপোর্ট

রাজধানীর মিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে গড়ে ওঠা ভাসমান দোকান ও হকারদের উচ্ছেদের পর বদলে গেছে এলাকার চিত্র। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেট হয়ে মিরপুর-১৩ নম্বর পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের ফুটপাত এখন অনেকটাই ফাঁকা। কোথাও কোথাও প্রশস্ত হয়ে উঠেছে পথচারীদের চলাচলের জায়গা, কমেছে সড়কের ওপর দোকানপাটের চাপ।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও পরে আবারও অভিযান চালিয়ে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়।

মিরপুর-১০, হোপ মার্কেট থেকে মিরপুর-১৩—যেসব এলাকায় উচ্ছেদ

অভিযানের পর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর, হোপ মার্কেট ও এর আশপাশের সড়ক-ফুটপাত থেকে ভাসমান দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ১১/১ ও ১১/২ নম্বর লেন, বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পাশের ফুটপাত, মিরপুর আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা এবং সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২-এর সড়ক ও ফুটপাতের বড় অংশও দখলমুক্ত হয়েছে।

সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-২ থেকে ৬ নম্বর লেন পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার সড়কের দুই পাশের ফুটপাতের বড় অংশ আগে দোকানপাটে দখল ছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। সেখানে নারী ও শিশুদের পোশাক, জুতা, অলংকার, প্রসাধনী থেকে শুরু করে ফুচকা, চটপটি ও ভাজাপোড়ার দোকানও বসত।

অভিযানের পর এসব অস্থায়ী দোকান সরিয়ে নেওয়ায় ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা তৈরি হয়েছে। মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৩ পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকাতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।

এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ থেকে ওসমানী হল ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) এলাকা পর্যন্তও সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ডিএনসিসির অভিযান হয়েছিল। ওই অভিযানে অবৈধ দোকান, হকার ও বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি অনুমোদনহীন বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড ও ইউনিপোল সাইন অপসারণ করা হয়।

‘আগে হাঁটার জায়গা ছিল না, এখন স্বস্তিতে চলতে পারছি’

উচ্ছেদের পর স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের একটি অংশ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। মিরপুরের ৬ নম্বর লেনের বাসিন্দা ফরিদা বেগম বলেন, আগে রাস্তা ও ফুটপাত দিয়ে হাঁটা কঠিন ছিল। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে চলাচলে সমস্যা হতো। এখন তিনি সন্তানকে নিয়ে তুলনামূলক স্বচ্ছন্দে হাঁটতে পারছেন।

হোপ মার্কেটের পাশের বি ব্লকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামও ফুটপাত খালি হওয়ায় স্বস্তির কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর এখন বাসা থেকে বের হয়ে ভালো লাগছে।

মিরপুরে কেনাকাটা করতে আসা দুই শিক্ষার্থীও ফুটপাত ফাঁকা থাকায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁদের একজন সুরাইয়া মিম বলেন, এতদিন এই সড়ক যে এতটা প্রশস্ত এবং পাশে হাঁটার ফুটপাত রয়েছে, তা বোঝার উপায় ছিল না। আরেকজন নওশীন জাহান বলেন, ফুটপাত ও সড়কজুড়ে হকারদের দোকানের কারণে স্থানীয়দের যে ভোগান্তি হতো, এখন ফাঁকা জায়গা দেখে সেটি বোঝা যাচ্ছে।

নাগরিকদের স্বস্তির সঙ্গে আছে নতুন শঙ্কাও

তবে উচ্ছেদের পর স্থানীয়দের একটি প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে—এই জায়গাগুলো কতদিন দখলমুক্ত থাকবে?

বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান চালিয়ে ফুটপাত খালি করলেই হবে না; নিয়মিত নজরদারি করে নতুন করে দোকানপাট বসানো ঠেকাতে হবে। অতীতে অনেক এলাকায় উচ্ছেদের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ফুটপাত দখলের ঘটনা ঘটেছে। ফলে মিরপুরের বর্তমান পরিবর্তন ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আবার কেউ ফুটপাত দখল করে বসতে পারে কি না, এমন আশঙ্কার কথাও আলোচনায় রয়েছে। তবে এ ধরনের আশঙ্কার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় এটিকে অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং নাগরিকদের উদ্বেগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাঁদের মূল দাবি—ফুটপাত কারও রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবের জায়গা না হয়ে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকুক।

এ কারণেই বাসিন্দারা চান, উচ্ছেদের পর ডিএনসিসির নিয়মিত তদারকি আরও জোরদার হোক। কোথাও নতুন করে দোকান বসানোর চেষ্টা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

শুধু উচ্ছেদ নয়, বিকল্প ব্যবস্থার কথাও বলছে সিটি করপোরেশন

ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার কথা জানিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ। ঢাকার অন্য এলাকায় ডিএসসিসি প্রশাসকও বলেছেন, হকারদের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুনবাগিচায় দখলমুক্ত ফুটপাত সংস্কার করে ডাস্টবিন, বেঞ্চ ও সৌন্দর্যবর্ধনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এতে ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শুধু উচ্ছেদ নয়, পথচারীদের ব্যবহারযোগ্য পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও সামনে এসেছে।

মিরপুরেও একইভাবে দখলমুক্ত জায়গাগুলো যেন আবার অস্থায়ী বাজারে পরিণত না হয়, সেটিই এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা।

নিয়মিত নজরদারিতেই স্থায়ী হবে পরিবর্তন

মিরপুরের ফুটপাতের বর্তমান চিত্রে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ বেড়েছে—এমন অভিজ্ঞতা স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি ও আইন প্রয়োগ।

ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ইতোমধ্যে বলেছেন, নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। ৬ অক্টোবর রাতে তিনি নিজে মিরপুর-১০ এলাকা পরিদর্শন করেন এবং উচ্ছেদের পর খালি হওয়া জায়গায় দ্রুত গাছ লাগানোর নির্দেশ দেন। একই সময় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

ফলে মিরপুরে এখন নাগরিকদের প্রত্যাশা একটাই—উচ্ছেদের সুফল যেন সাময়িক না হয়। ফুটপাত যেন পথচারীদের জন্যই থাকে, সড়কে যেন অস্থায়ী দোকান ফিরে না আসে এবং রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো প্রভাব ব্যবহার করে কেউ নতুন করে দখল নিতে না পারে।

মিরপুরের বর্তমান পরিবর্তন তাই শুধু একটি উচ্ছেদ অভিযানের ফল নয়; এটি নিয়মিত তদারকি, নাগরিক সচেতনতা ও নগর ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতার পরীক্ষাও। এই জায়গাগুলো দখলমুক্ত রেখে পরিচ্ছন্ন ও চলাচলবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে নগরবাসীর জন্যই এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19094 ,   Print Date & Time: Wednesday, 7 October 2026, 03:11:00 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh