![]()
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্যারিসের রাজপথে তখন ড্রামের তালে তালে স্লোগান আর মানুষের কোলাহল। শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটের প্রতিবাদে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের ভিড়ে বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল ১৬ বছর বয়সী ইয়ানিস। তার অভিযোগ, স্কুলে প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধাও নেই। নেই শৌচাগার ব্যবহারের উপযোগী পরিবেশ, নেই টয়লেট পেপার; অনেক কিছুই ভাঙাচোরা। দীর্ঘ সময় ক্লাস করতে হলেও বিশ্রামের সুযোগ খুবই কম।
মঙ্গলবার ইয়ানিস জানায়, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তাকে ক্লাস করতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মাত্র এক ঘণ্টা বিরতি থাকে। সার্সেলস শহরতলি থেকে প্যারিসের বিক্ষোভে যোগ দেওয়া এই কিশোরের ভাষ্য, একেকটি শ্রেণিকক্ষে ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে বসতে হয়। তার মতে, এমন পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়।
ইয়ানিসের কথা বলার সময় পাশে থাকা অন্য কিশোররাও সম্মতি জানায়। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, শিক্ষক সংকট কাটানো এবং স্কুলের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে তারা বিক্ষোভে অংশ নেয়।
গত মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার প্যারিসের রাজপথে প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ অংশ নেয়। একই দিনে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় হাইস্কুল অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। শিক্ষক সংকট, দীর্ঘ ক্লাস রুটিন, প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন জরাজীর্ণ স্কুল ভবন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। সংকট সমাধানে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তারা।
প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দো লা রিপাবলিক চত্বরে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হন। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘২০২৬ হলো নতুন ১৭৮৯।’ এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়।
আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে বিক্ষোভস্থলে এমানুয়েল মাখোঁর পদত্যাগের দাবি এবং কট্টর ডানপন্থিদের সমালোচনা করে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। ড্রামের তালে নাচ, গান ও হাততালির মধ্য দিয়ে নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরেন আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষোভস্থলের প্রাণবন্ত পরিবেশের পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর কথায় উঠে আসে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কথা। ইয়ানিসের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৫ বছর বয়সী ফিদেলের স্বপ্ন আইনজীবী হওয়া। তবে স্কুলের বর্তমান পরিস্থিতি তার সেই স্বপ্ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ফিদেল বলে, ‘আমি যখন এই পুরো ব্যবস্থাটির (সিস্টেম) দিকে তাকাই, তখন নিজেকেই বলি, এই দেশে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’
তার পাশে থাকা ১৬ বছর বয়সী নোহামের লক্ষ্য কম্পিউটার প্রকৌশলী হওয়া। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ ও শিক্ষক সংকট তার সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে বলে জানায় সে।
নোহাম আরও বলে, ‘যথাযথ শিক্ষার সুযোগ না পেলে আমি আমার স্বপ্নের চাকরি কখনোই পাব না। এটি আমার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করছে।’
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন নাদিন জিলিয়াকাস। তার অভিজ্ঞতায়, কম বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একই ধরনের হতাশা দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের অনেকের কথায় অন্ধকারের আশঙ্কা ফুটে ওঠে।
এই শিক্ষিকা বলেন, ‘আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে নিজের ভালোলাগার বিষয়ের ওপর চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেই। কিন্তু জবাবে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরাও এখন বলে, ‘এসবের কোনো মানে হয় না। আমরা এমনিতেও চাকরি পাব না।’’