• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > সরকারি খরচে বেসরকারি হাসপাতালে মিলবে চিকিৎসাসেবা

সরকারি খরচে বেসরকারি হাসপাতালে মিলবে চিকিৎসাসেবা

  • বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪১
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে চিকিৎসাসেবা সহজ করতে বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ও সেবা কেনার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নেওয়া এই উদ্যোগের শুরুতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরে চট্টগ্রাম ও সিলেটেও এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢামেক হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর একটি অংশ সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে। সেখানে রোগীদের শয্যাভাড়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আলাদা অর্থ দিতে হবে না। সরকারি হাসপাতালে যেসব সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, একই সুবিধা বেসরকারি হাসপাতাল থেকেও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মাস শেষে রোগীপ্রতি ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে বিল পরিশোধ করবে সরকার।

প্রাথমিকভাবে মেডিসিন, শিশু বিভাগ এবং ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের রোগীদের এই ব্যবস্থার আওতায় নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড হাসপাতাল (বর্তমানে কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল) সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।

ঢামেকের মতো সরকারি মূল্যে চিকিৎসা

২ হাজার ৬০০ শয্যার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়মিত ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। এতে শয্যার সংকট তৈরি হয় এবং অনেক রোগীকে মেঝে কিংবা করিডোরে চিকিৎসা নিতে হয়। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসকরাও হিমশিম খান। পাশাপাশি দালালচক্রের মাধ্যমে রোগীদের প্রতারিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোর একটি অংশের শয্যা খালি থাকে। সেই অব্যবহৃত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমানোই উদ্যোগটির লক্ষ্য।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতালে বেডের তুলনায় রোগী কম থাকে। তাই সরকারি হাসপাতাল থেকে সেখানে রোগী পাঠানো হলে চাপ অনেকটা কমবে।’

রোগীদের বাড়তি অর্থ দিতে হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের মতোই রোগীদের বেডের জন্য কোনো অর্থ দিতে হবে না, কনসালট্যান্টের জন্যও অর্থ দেওয়া লাগবে না। যে সমস্ত ওষুধ সরবরাহ আছে, সেটার জন্যও টাকা দিতে হবে না। যে সমস্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, সেটার জন্যও খরচ করতে হবে না। অর্থাৎ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর যা খরচ হতো, সেখানেও একই খরচ হবে।’

বেডের সংকটে বিকল্প হাসপাতালে পাঠানো হবে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. ফোয়ারা তাসমিম বলেন, ‘ইমার্জেন্সি বা জীবনাশঙ্কা আছেÑ এমন নয়; অথচ ছাত্রছাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বেডের অভাবে চিকিৎসাসেবা দেরি হবেÑ এমন রোগীকে নির্দিষ্ট মূল্যে বেসরকারি হাসপাতালে রেফার করা হবে। সরকারও রোগীর জন্য খরচ বহন করবে। এর ফলে এসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রছাত্রীদের শেখাও হবে, আবার রোগীরাও সরকারি মূল্যে সেবা পাবেন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রোগী ব্যবস্থাপনা, সেবার ধরন ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি হয়েছে। প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালের কার্যক্রম তদারকিতে সাত সদস্যের মনিটরিং কমিটি গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অনিয়ম ঠেকাতে থাকবে ডিজিটাল নজরদারি

কোভিড মহামারির সময় সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে ভুয়া রোগী দেখিয়ে বিল করার মতো নানা অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন ব্যবস্থায় অনলাইনভিত্তিক নজরদারি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রোগী ভর্তি, রেফারেল ও ডিসচার্জের তথ্য সফটওয়্যারভিত্তিক ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে। পরে এসব তথ্যের সঙ্গে হাসপাতালের বিল মিলিয়ে দেখা হবে। এতে রোগী না থাকলেও বিল তৈরি করা বা সেবা না দিয়েও অর্থ দাবি করার সুযোগ কমবে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্যোগটি এখনো চূড়ান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। এ বিষয়ে কোনো গেজেটও হয়নি। পরিকল্পনা বিভাগ থেকে প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে। সরকার কত অংশ ব্যয় করবে, রোগীর কোনো অর্থ দিতে হবে কি না এবং কোন হাসপাতালে কীভাবে সেবা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ও চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।

বেসরকারি সেবার পাশাপাশি সরকারি সক্ষমতা ব্যবহারের তাগিদ

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কেনার ক্ষেত্রে রোগী নির্বাচন ও ব্যয়ের বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিওর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

ঢাকার অভিজাত এলাকায় সাধারণ সময়ে সরকারি অর্থে বেসরকারি সেবা কেনার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ছাড়া সাধারণ অবস্থায় ঢাকা শহরে বেসরকারি খাত থেকে এভাবে সেবা নেওয়া সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যের বিপরীত হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু বা অন্য জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ কিংবা শয্যা সংকট দেখা দিলে বেসরকারি সক্ষমতা ব্যবহার করা যৌক্তিক। তবে উচ্চবিত্তের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় হলে স্বাস্থ্যবৈষম্য বাড়তে পারে। সেবা কেনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য, মানদণ্ড ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

এদিকে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালের অব্যবহৃত সক্ষমতাও কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রায় ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ২১২টি আইসিইউ রয়েছে। অথচ দীর্ঘ সময় ৭০০ থেকে ৮০০ শয্যা খালি পড়ে থাকে।

ডা. মুশতাক হোসেন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, হাসপাতালটিকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ হাসপাতালে রূপান্তর করা গেলে সরকারি খাতেই বড় চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি হতে পারে। এতে ঢামেকের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বেসরকারি সেবা কেনার প্রয়োজনও কিছুটা কমবে। তাঁদের মতে, সঠিক রোগী নির্বাচন, নির্ধারিত মূল্য, ডিজিটাল নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটি স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19058 ,   Print Date & Time: Wednesday, 7 October 2026, 09:41:36 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh