• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > ব্যাংক খাত সংস্কারে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন পরিকল্পনা

ব্যাংক খাত সংস্কারে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন পরিকল্পনা

  • বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৩৮
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, প্রভিশন ঘাটতি কমানো এবং ব্যাংক তদারকি জোরদারের পাশাপাশি আমানতকারীর সুরক্ষায় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারের ‘ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর আওতায় জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ পর্যন্ত এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পুরো কার্যক্রমকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম বছরে পুনরুদ্ধার, প্রথম থেকে তৃতীয় বছরে পুনঃস্থাপন এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরে পুনর্গঠনের কাজ হবে।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি। এর আগে মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

একই সময়ে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। জুন শেষে ১৫টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার সক্ষমতা নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে।

সংস্কার পরিকল্পনায় তাই শুধু নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো নয়, পুরোনো ঋণের মান যাচাই, খেলাপি ঋণ আদায়, প্রভিশন সংরক্ষণ এবং ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে সংস্কার

পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ব্যাংক খাতের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা হবে। এরপর ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার কাজ হবে। শেষ পর্যায়ে কাঠামোগত পুনর্গঠনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এতে দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ থাকবে। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিও জোরদার করা হবে।

ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির দায়িত্বে থাকা সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত নতুন ও উদীয়মান তারল্য সংকটসহ একাধিক আন্তঃসম্পর্কিত কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। শুধু সাময়িক তারল্য সহায়তা বা কিছু নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর মতে, আগামী পাঁচ বছরের সংস্কার পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংক খাতের বিদ্যমান অনেক সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

বাড়বে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন

সংস্কার পরিকল্পনার অন্যতম দিক হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি। এর মাধ্যমে ব্যাংক তদারকি ও নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

স্বায়ত্তশাসনের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারের কাঠামোর বাইরে নেওয়া নয়। বরং আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে মুদ্রানীতি, ব্যাংক তদারকি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু সরকারের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার বিষয় নয়। আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩৮এ অনুযায়ী, গভর্নরকে বছরে অন্তত একবার সংসদের অর্থবিষয়ক কমিটির সামনে মুদ্রানীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন দিতে এবং প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এ ছাড়া বার্ষিক হিসাব ও পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে দেওয়ার বিধান রয়েছে।

দুর্বল ব্যাংক ও আমানতকারীর সুরক্ষা

সংস্কারের আওতায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে। মূলধন, তারল্য, সুশাসন বা সম্পদের মানে সমস্যা থাকা ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন বা রেজল্যুশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, একজন আমানতকারীর প্রতি সদস্য প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষিত থাকবে। আগে এ সীমা ছিল ১ লাখ টাকা। ব্যাংক সংকটে পড়লে আমানতকারীর অর্থ ফেরতের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে রেজল্যুশনের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনেও আমানত সুরক্ষা তহবিল ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর নজরদারি

খেলাপি ঋণ কমাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ব্যাংকভিত্তিক সম্পদমান যাচাইকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। যেসব ব্যাংকে ঋণের মান, পরিচালনা বা ঋণ কেন্দ্রীভবনের ঝুঁকি বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজরদারি করা হবে।

বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের বিশেষায়িত পুনরুদ্ধার ইউনিট ও আইন বিভাগকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রম দ্রুত করা এবং জামানত কার্যকরভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19056 ,   Print Date & Time: Wednesday, 7 October 2026, 09:41:37 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh