![]()
ইবি রিপোর্ট
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদন ব্যয় নিয়ে চাপ রয়েছে। তেল ও গ্যাসের দামের ওঠানামার প্রভাব পড়ছে জ্বালানি নিরাপত্তায়ও। এমন পরিস্থিতিতে লোডশেডিং মোকাবিলার পাশাপাশি নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের দিকে আগ্রহ বাড়ছে গ্রাহকদের।
আগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার মূলত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ব্যাকআপ দেওয়ার মধ্যে সীমিত ছিল। এখন রুফটপ সোলার ও ব্যাটারি স্টোরেজের মাধ্যমে দিনের চাহিদার একটি অংশ নিজস্বভাবে মেটানো যাচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে।
বাড়ছে রুফটপ সোলারের ব্যবহার
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ ইউটিলিটির নেটওয়ার্কে ৪ হাজার ৪৯০টির বেশি নেট-মিটার্ড রুফটপ সোলার সিস্টেম যুক্ত হয়েছে। এসব সিস্টেমের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট।
নেট মিটারিংয়ের আওতায় গ্রাহক নিজের স্থাপনায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ আগে ব্যবহার করতে পারেন। উৎপাদনের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও রয়েছে। ফলে একই গ্রাহক বিদ্যুৎ উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই ভূমিকাতেই থাকতে পারেন।
রুফটপ সোলারের ব্যবহার আরও বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা চালু করেছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারি করা প্রজ্ঞাপনে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সোলার সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গ্রিডে বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ৫০ পয়সা
বিদ্যুৎ বিভাগের জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় এ প্রণোদনা কাঠামো চালু হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ রুফটপ সোলার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ধরে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
৮ টাকা উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে বিদ্যুৎ বিভাগের ১৯ আগস্টের বৈঠকেও এক বছরের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেটি বিশেষ প্রণোদনা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ব্যাটারি বাড়াচ্ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার
সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সূর্যের আলো না থাকলে উৎপাদন কমে যাওয়া। কিন্তু বিদ্যুতের চাহিদা থাকে দিন-রাতজুড়ে। এ কারণে দিনের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমিয়ে রাতে বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ব্যবহারের সুযোগ সৌরবিদ্যুতের কার্যকারিতা বাড়াচ্ছে।
শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, লিথিয়াম ব্যাটারির দ্রুত চার্জ, তুলনামূলক দীর্ঘ কার্যক্ষমতা ও কম জায়গায় স্থাপনের সুবিধার কারণে এ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে লিথিয়াম ও প্রচলিত ব্যাটারির বর্তমান মূল্য বা মোট ব্যবহারের ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব পাওয়া যায়নি।
রহিমআফরোজ ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের হেড অব সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং নওয়াজ আব্দুর রহিম বলেন, এখন গ্রাহকেরা শুধু লোডশেডিংয়ের সময় ব্যাকআপ চান না। তারা এমন নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি সমাধান চান, যা ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যয় ও বৈশ্বিক জ্বালানি অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, রুফটপ সোলার, স্মার্ট আইপিএস ও ব্যাটারি স্টোরেজের সমন্বিত প্রযুক্তি গ্রাহকদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ দিচ্ছে। ৬০০ ওয়াট থেকে শুরু করে ১০০ কিলোওয়াটের বেশি সক্ষমতার এসব সমাধান আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা যায়।
নওয়াজ আব্দুর রহিম আরও বলেন, গ্রাহকেরা এখন আলাদা আলাদা পণ্যের পরিবর্তে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ সমাধান নিতে আগ্রহী। সোলার প্যানেল, স্মার্ট আইপিএস ও লিথিয়াম ব্যাটারিসহ সমন্বিত এনার্জি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে রহিমআফরোজের।
সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল নির্দিষ্ট হারে কমবে—এমন কোনো জাতীয় গড় নেই। সিস্টেমের আকার, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন, দিনের সময়ে চাহিদা এবং ব্যাটারি ব্যবহারের ওপর সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ভর করে।
একটি গবেষণায় নির্দিষ্ট আবাসিক মডেলে রুফটপ সোলার ও উন্নত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ৪০ দশমিক ৭ থেকে ৫০ দশমিক ১ শতাংশ মাসিক বিল সাশ্রয়ের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে সৌরবিদ্যুৎ
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতার চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সেন্টার ফর লিগ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৭২২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। গত আট বছরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হয়েছে।
একই গবেষণা অনুযায়ী, এ সময়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ এড়াতে সহায়তা করেছে। এসব হিসাব গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুতের সামগ্রিক প্রভাবের; শুধু রুফটপ সোলারের নয়।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসার তাই বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি, উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গেও যুক্ত। সরকারের ৪ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হলে রুফটপ সোলারের বাজার আরও বড় হতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সহজ অর্থায়ন, কার্যকর নেট মিটারিং, মানসম্মত প্রযুক্তি ও নীতির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।