• হোম > দেশজুড়ে > চট্টগ্রাম বন্দরের ছবি-ভিডিও প্রকাশে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক

চট্টগ্রাম বন্দরের ছবি-ভিডিও প্রকাশে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক

  • বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫০
  • ২৪

---

 

ইবি রিপোর্ট

চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল স্থাপনা সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে বন্দর-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশে নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। পূর্বানুমতি ছাড়া এসব তথ্য প্রকাশ বা প্রচার না করতে গণমাধ্যম ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সতর্ক করা হলেও, নির্দেশনার আইনগত ভিত্তি এবং এর ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

৬ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিপিএ জানায়, পূর্বানুমতি ছাড়া বন্দরের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ, পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম, নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও, নকশা এবং পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।

নোটিশে বলা হয়েছে, নির্দেশনা অমান্য করা হলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর আওতায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম স্বাক্ষরিত নোটিশটি বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ও ব্যুরোপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য বিদেশি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব ঘিরে উত্তেজনা চলছে।

এ ঘটনায় আন্দোলনকারীরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাকে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগও তুলেছেন তারা। আগামী ১৩ অক্টোবর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও এবং তাকে কার্যালয় থেকে বের হতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বন্দর-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশে নতুন বিধিনিষেধকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, এটি শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ কি না এবং এর ফলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে কি না।

সিপিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিচালনাগত কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখতেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তার নামে যেকোনো বিধিনিষেধ ঝুঁকির ধরন ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম বন্দরের ক্ষেত্রে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, ‘বন্দর একটি বহু পক্ষের অংশগ্রহণে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধি ও কর্মীরা দিনরাত কাজ করেন। আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩’ বন্দরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।’

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার নির্দেশনাটিকে অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, বন্দর নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া অসন্তোষের খবর প্রকাশ ঠেকাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বন্দর নিয়ে আমরা যে ষড়যন্ত্রের কথা মনে করি, তা নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ। এই উদ্যোগ মূলত সেই জনঅসন্তোষের খবর প্রকাশ ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।’

তবে জাতীয় স্বার্থে প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপকে তার কমিটি সমর্থন করবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘জনগণের ওপর এ ধরনের নির্দেশনা জারি করার অধিকার কারও নেই।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আক্তার কবির চৌধুরী বলেন, তথ্য অধিকার আইন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে। জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় ছাড়া অন্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধানের ক্ষেত্রে এই আইনকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় ছাড়া তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। যদি তথ্য অধিকার আইনের মূলনীতি এটাই হয়, তাহলে বন্দরে এমন কী সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে যে হঠাৎ করে সবকিছু গোপন রাখতে হবে?’

সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেরিটাইম ল সোসাইটির সভাপতি মোহিউদ্দিন আবদুল কাদির বলেন, আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তাবিধিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তানীতিতে সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে।

তবে তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে, কোনো বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত সব পরিচালনাগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গোপনীয় হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি দেশের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। জাহাজ পরিচালনা, পণ্য পরিবহন, পণ্যজট, দুর্ঘটনা, অবকাঠামো এবং বন্দর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক এবং বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।’

এদিকে, বন্দরের একটি বড় অংশ বন্দরসংলগ্ন উঁচু উড়ালসড়ক থেকেও দৃশ্যমান। একই সময়ে নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে কনটেইনার হারিয়ে যাওয়া এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে পণ্যবোঝাই কনটেইনার বন্দর ফটক দিয়ে বের করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ফলে আলোচনার কেন্দ্রে এখন শুধু বন্দরের নিরাপত্তা নয়, বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়, সেটিও। নির্দিষ্টভাবে কোন তথ্য সংবেদনশীল এবং কোনটি প্রকাশযোগ্য—এ বিষয়ে পরিষ্কার মানদণ্ড না থাকলে সাংবাদিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারকে ঘিরে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19038 ,   Print Date & Time: Wednesday, 7 October 2026, 08:40:19 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh