• হোম > অর্থনীতি | মতামত > অর্থনীতির আকাশে কোথাও রোদ, কোথাও মেঘ

অর্থনীতির আকাশে কোথাও রোদ, কোথাও মেঘ

  • বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩১
  • ২২

---

আহমেদ তোফায়েল

মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারে গিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম। হাতে বেতনের কিছু টাকা তখনো আছে। পকেটে সংসারের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের তালিকা—চাল, ডাল, মাছ, সবজি, ওষুধ। খুব বেশি কিছু নয়।

কিন্তু বাজারে গিয়ে তালিকাটি ছোট করতে হলো। একটি পণ্যের দাম দেখে সেটি বাদ দিলেন। আরেকটির পরিমাণ কমালেন। মাছের বদলে অন্য কিছু নিলেন। ওষুধের টাকা আলাদা করে রেখে যতটুকু সম্ভব বাজারের ব্যাগে তুললেন।

বাড়ি ফেরার সময় ব্যাগটি খুব ভারী ছিল না।

রফিকুলের গল্পটি আলাদা কোনো গল্প নয়। মধ্যবিত্ত পরিবার, চাকরিজীবী, শ্রমিক কিংবা কৃষক—অনেকের মাসের শেষের হিসাব এখনো খরচ আর আয়ের টানাপোড়েনের হিসাব। অথচ একই সময়ে দেশের অর্থনীতির আরেকটি ছবি সামনে আসছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে। রপ্তানি বাড়ছে। ডলারের বাজারে আগের মতো অস্থিরতা নেই।

তাহলে প্রশ্ন হলো—দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মানুষের সংসারে তার ছাপ এত কম কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা কিছুটা পরিষ্কার হয়। আমরা কয়েক বছর আগের তীব্র সংকটের জায়গায় নেই। কিন্তু অর্থনীতির সুফল এখনো মানুষের জীবনে স্বস্তি হয়ে পৌঁছানোর মতো অবস্থায়ও যাইনি।

রিজার্ভের অঙ্ক ভালো হয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, আগস্ট ২০২৬ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে তা ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে, আগস্ট ২০২৫ শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতির জন্য এটি স্বস্তির খবর।

কয়েক বছর আগে ডলার–সংকট আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি করেছিল। এখন সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। রিজার্ভ বাড়লে একটি দেশ প্রয়োজনীয় আমদানি মেটাতে বেশি সক্ষম থাকে এবং বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা বাড়ে। কিন্তু এখানেই একটি পার্থক্য বুঝতে হবে। রিজার্ভ বাড়া মানে মানুষের আয় বেড়ে যাওয়া নয়। রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের নিরাপত্তা দেয়, কিন্তু সরাসরি কারও বেতন বাড়ায় না। মানুষের জীবনে স্বস্তি আসে কাজ, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আয় থেকে। অর্থাৎ রিজার্ভের উন্নতি অর্থনীতির জন্য ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তির ওপর বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা বাড়ানো যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।

বিমানবন্দরের ডলার থেকে ঘরের আয়

রুমানা বেগমের স্বামী সৌদি আরবে কাজ করেন। মাস শেষে দেশে টাকা পাঠান। সেই অর্থেই সংসারের বড় একটি অংশ চলে। বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের সঙ্গে এই গল্প মিলে যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে ৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বরে এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্সের গুরুত্ব দুই জায়গায়। একদিকে এটি সরাসরি পরিবারের আয় বাড়ায়, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে রিজার্ভকে সহায়তা করে। তবে এই সাফল্যের ভেতরেও একটি প্রশ্ন আছে। দেশের বাইরে গিয়ে যে আয় করতে হচ্ছে, সেই একই ধরনের আয়ের সুযোগ কি দেশের ভেতরে তৈরি হচ্ছে? যদি না হয়, তাহলে রেমিট্যান্স একদিকে আমাদের শক্তি, অন্যদিকে দেশের কর্মসংস্থানের ঘাটতির কথাও মনে করিয়ে দেয়। এখন দরকার রেমিট্যান্সের একটি অংশকে উৎপাদনশীল কাজে নিয়ে যাওয়া। পরিবারের ভোগের পাশাপাশি ব্যবসা, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প বা সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে এই অর্থ আরও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন কতটা?

রপ্তানির ছবিও এখন কিছুটা ভালো। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে এককভাবে রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তৈরি পোশাক এই প্রবৃদ্ধির বড় চালক।

বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা আছে—এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ কতটা হচ্ছে, নতুন কারখানা কতটা হচ্ছে, উৎপাদন সক্ষমতা কতটা বাড়ছে এবং নতুন কতজন শ্রমবাজারে ঢুকছেন—এসব প্রশ্নও দেখতে হবে। কারণ রপ্তানি আয় বাড়া তখনই বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যখন তার সঙ্গে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ে।

বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন এমন একটি ধারাবাহিকতা—রপ্তানি বাড়বে, বিনিয়োগ আসবে, উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং মানুষের আয় বাড়বে। এই ধারাটি শক্তিশালী না হলে বৈদেশিক খাতের ভালো খবর দেশের ভেতরের অর্থনীতিতে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়বে না।

টাকা আছে, কিন্তু বিনিয়োগের সাহস কোথায়?

এই জায়গায় এসে ব্যাংক ঋণের হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুনে ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। কিছুটা উন্নতি হলেও ঋণের প্রবৃদ্ধি এখনো কম। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহারও কমিয়েছে। আগস্টে ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকেও তা ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। কিন্তু শুধু সুদের হার কমলেই বিনিয়োগ বাড়ে না।

একজন উদ্যোক্তা ব্যাংকের সুদের হার দেখেন ঠিকই, কিন্তু তার আগে দেখেন বাজারে চাহিদা আছে কি না। বিদ্যুৎ-গ্যাস পাওয়া যাবে কি না। কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা হবে কি না। করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে কি না। ব্যাংক ঋণ পেতে কত সময় লাগবে। ব্যবসা শুরু করতে কতগুলো অনুমোদন প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগের জন্য শুধু টাকা নয়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাও দরকার। এই আস্থার ঘাটতি দূর করা এখন অর্থনীতির বড় কাজ।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, বাজারে জিনিসের দাম কি কমেছে?

এবার আবার রফিকুলের বাজারে ফিরি। ধরা যাক, গত মাসে কোনো পণ্যের দাম ছিল ১২০ টাকা। এবার সেটি ১২২ টাকা। দাম বেড়েছে, কিন্তু আগের মতো দ্রুত নয়। মূল্যস্ফীতির অর্থ এটাই—দাম বাড়ার গতি। মূল্যস্ফীতি কমেছে মানেই বাজারদর আগের জায়গায় ফিরে গেছে, এমন নয়।

আগস্টে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে চাপ কিছুটা কমেছে। কিন্তু পরিবারের খাতায় চাপ এখনো আছে। কারণ গত দুই বছরে যে পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়েছে, তার দাম কমে আগের জায়গায় না এলে মানুষের অনুভূতিতে স্বস্তি আসতে সময় লাগে। এই কারণেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আয় বাড়ানোও জরুরি।

বেতন বাড়লেও প্রকৃত আয় কেন বাড়ছে না

আগস্টে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। ধরা যাক, একজন শ্রমিকের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২১ হাজার ৬০০ টাকা হলো। কাগজে আয় বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ যদি আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে বাড়তি আয়ের বড় অংশই খরচ হয়ে যাবে। অর্থনীতির ভাষায় এখানেই প্রকৃত আয়ের প্রশ্ন আসে।

পরিবারের কাছে শেষ পর্যন্ত হিসাবটা খুব সরল—মাসের সব খরচ মিটিয়ে হাতে কত টাকা থাকল? তাই মূল্যস্ফীতি কমানোর সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানো, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় কমানো, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো জরুরি। শুধু বাজারে নজরদারি করে দীর্ঘমেয়াদে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদনের গতি কী বলছে

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে—এটি ইতিবাচক। তবে একই সময় বৃহৎ শিল্পের উৎপাদনে দুর্বলতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে বৃহৎ শিল্প উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ০ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমেছে। আগের বছর একই সময়ে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখলে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—প্রবৃদ্ধি কতটা উৎপাদননির্ভর?

শিল্পের গতি শুধু কারখানার মালিক বা শ্রমিকের বিষয় নয়। শিল্প কাঁচামাল কেনে, ব্যাংক ঋণ নেয়, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, পরিবহন নেয়, কর দেয় এবং অনেক ছোট ব্যবসাকে কাজ দেয়। তাই শিল্পের গতি কমলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্য খাতেও পৌঁছায়। এ কারণে শুধু জিডিপি কত বাড়ল, সেটি যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে সেই প্রবৃদ্ধি কতটা উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং কতটা নতুন কাজ তৈরি করছে।

ব্যাংক খাতের ক্ষত সারাতেই হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি ব্যাংক খাত। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমস্যাগ্রস্ত।

একজন আমানতকারী হয়তো এই বিশাল অঙ্কের সঙ্গে নিজের জীবনের সম্পর্ক খুঁজে পান না। কিন্তু সম্পর্কটি সরাসরি।

মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখেন। ব্যাংক সেই টাকা ঋণ দেয়। ঋণ ফেরত না এলে ব্যাংকের মূলধনে চাপ পড়ে। নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতির অর্থপ্রবাহের সমস্যাও।

এখন প্রয়োজন খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব করা, ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন করা এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক সমস্যায় পড়া উদ্যোক্তাদের পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যাংকের অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি আমানতকারীর টাকা এবং অর্থনীতির সঞ্চয়।

সরকারের হিসাবেও চাপ আছে

সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের কর রাজস্ব ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু লক্ষ্যের মাত্র ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশ আদায় হয়েছে। অর্থাৎ আদায় বাড়লেও সরকারের প্রয়োজনের তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। রাজস্ব দুর্বল হলে সরকারের উন্নয়ন ও জনসেবামূলক ব্যয় সামলানো কঠিন হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় এর প্রভাব পড়তে পারে। সমাধান শুধু করহার বাড়ানো নয়। করজাল বড় করতে হবে। যাঁরা আয় করেন কিন্তু করের আওতায় নেই, তাঁদের যুক্ত করতে হবে। আয়, সম্পদ, ব্যবসা ও লেনদেনের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। একই করদাতার ওপর চাপ বাড়ানোর বদলে নতুন করদাতা তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর পথ।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা চাকরির

রফিকুলের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। হাতে একটি ডিগ্রি আছে, কিন্তু স্থায়ী চাকরি নেই। এই তরুণের কাছে দেশের ৩৭ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভের চেয়ে একটি ভালো চাকরি বেশি মূল্যবান। এটাই অর্থনীতির সবচেয়ে মানবিক পরীক্ষা।

রিজার্ভ, জিডিপি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স—সবই প্রয়োজনীয় সূচক। কিন্তু একজন তরুণ যখন চাকরি খোঁজেন, তখন তাঁর কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে বাস্তব সূচক হলো—কাজের সুযোগ আছে কি না। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, ব্যবসা বাড়ানোর পরিবেশ আছে কি না। একজন শ্রমিক জানতে চান, মাসের আয় দিয়ে সংসার চলে কি না। একটি পরিবার জানতে চায়, সব খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব কি না। অর্থনীতির বড় অঙ্কগুলো শেষ পর্যন্ত এই ছোট ছোট প্রশ্নের কাছেই এসে থামে।

এখন আগুন নেভানোর পর ঘর মেরামতের সময়

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে। রপ্তানি বাড়ছে। রিজার্ভও আগের তুলনায় ভালো। সংকটের তীব্র সময়ে নীতিনির্ধারকদের কাজ থাকে আগুন নেভানো। এখন সেই আগুন কিছুটা কমেছে। তাই সামনে আরও কঠিন কাজ—অর্থনীতির ভেতরের কাঠামো ঠিক করা।

ব্যাংক খাত পরিষ্কার করতে হবে। বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে হবে। রাজস্বের ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। রপ্তানিতে নতুন খাত তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কর্মসংস্থানে। কারণ কর্মসংস্থান ছাড়া প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায় না। বাংলাদেশ এখন সংকটের সবচেয়ে কঠিন জায়গায় নেই। আবার স্বস্তির জায়গাতেও পৌঁছায়নি।

রিজার্ভের শেষ গন্তব্য কোথায়?

এক বছর পর আবার রফিকুল বাজারে গেলেন—এমন একটি ছবি কল্পনা করা যাক। এবার তাঁকে বাজারের তালিকা ছোট করতে হলো না। আয় কিছুটা বেড়েছে। ছেলের চাকরি হয়েছে। মাসের শেষে ব্যাংকে কিছু টাকা জমাতে পারছেন। প্রতিটি পণ্যের দাম দেখে আগের মতো হিসাব কষতে হচ্ছে না। রফিকুল হয়তো তখন জানবেন না দেশের রিজার্ভ কত বিলিয়ন ডলার। জানার প্রয়োজনও হবে না। তিনি শুধু বুঝবেন—সংসারটা একটু ভালো চলছে। অর্থনীতির সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আসলে সেখানেই।

একজন অর্থনীতিবিদ রিজার্ভ দেখবেন। একজন ব্যাংকার দেখবেন খেলাপি ঋণ। একজন ব্যবসায়ী দেখবেন সুদের হার। একজন রপ্তানিকারক দেখবেন ডলারের দাম। নীতিনির্ধারক দেখবেন জিডিপি। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখবেন তাঁর জীবন।

তাই আগামী দিনের অর্থনীতির হিসাব শুধু রিজার্ভ, জিডিপি বা রপ্তানি দিয়ে করা যাবে না। দেখতে হবে তরুণের চাকরি হয়েছে কি না, উদ্যোক্তা নতুন ব্যবসা করার সাহস পেয়েছেন কি না, শ্রমিকের প্রকৃত আয় বেড়েছে কি না, একটি পরিবার মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারছে কি না।

আর শেষ পর্যন্ত সেই বাজারের ব্যাগ—যেখান থেকে এই গল্পের শুরু।

রফিকুল যখন মাসের শেষে আবার বাজারে যাবেন, তখন তাঁর ব্যাগ কি আগের চেয়ে একটু বেশি ভরবে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির আসল উত্তরটি হয়তো সেখানেই।

কারণ অর্থনীতির শেষ কথা কোনো সংখ্যা নয়। শেষ কথা মানুষ।

আর সেই মানুষের ফিরে পাওয়ার স্বপ্নকে মনে করিয়ে দিতে জীবনানন্দ দাশের সেই পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে—

“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়।”

অর্থনীতিরও যেন সেই ফিরে আসা দরকার—সংকট থেকে স্বস্তিতে, অনিশ্চয়তা থেকে আস্থায়, স্থবিরতা থেকে উৎপাদনে, আর পরিসংখ্যানের পাতা থেকে মানুষের জীবনে। শেষ হিসাবটা তাই মানুষের পকেটেই।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19028 ,   Print Date & Time: Wednesday, 7 October 2026, 07:20:17 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh