• হোম > মতামত > আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ: প্রাসঙ্গিক ভাবনা ( ২য় পর্ব )

আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ: প্রাসঙ্গিক ভাবনা ( ২য় পর্ব )

  • মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:১৬
  • ৩৪

---

ড. মোঃ আশফাকুল ইসলাম বাবুল

সিরিজ: ২য় পর্ব

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা

সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, কারও অধিকার অক্ষুণ্ন রাখাসহ সুষ্ঠু জীবনযাপনে কোনো জটিলতা থাকলে তা সমাধানের জন্যই বিভিন্ন বিধি-নিষেধ বা আইন। এ আইন প্রণয়নকালে এর প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। আইন বাস্তবায়নে এর মূল প্রশাসনিক ইউনিট কারা হবে, তারা কীভাবে এ আইন প্রয়োগ করবে তারও একটা নির্দেশনা প্রথম থেকেই থাকবে।

আইন প্রণয়নের পর এর প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যথাযথ আইন থাকার পরও সময়মতো তা সুষ্ঠু প্রয়োগে ব্যর্থ হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইন বাস্তবায়নে ক্ষেত্রমতে তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হয়।

যেমন চুরি, মারামারি, টেন্ডারবাজির মতো অপরাধ দূরীকরণে আইনের তাৎক্ষণিক প্রয়োগের প্রয়োজন, যার ফলে সমাজে এ ধরনের অপরাধ ও অরাজকতা বৃদ্ধি রোধ করা যায়। আবার বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে, যা মানুষের ক্রমাগত কার্যকলাপ, যেমন বৃহৎ আকারে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন বা পাহাড় কাটা, পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণ প্রভৃতির কারণে সৃষ্টি হয় এবং যা একসময় গোটা বিশ্বকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। পরিবেশের এ বিপর্যয় রক্ষার জন্য এ বিষয়ে প্রণীত আইন বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে।

আইন বাস্তবায়ন, তাৎক্ষণিক হোক বা দীর্ঘমেয়াদি হোক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় প্রথম যে প্রশ্ন আসে তা হলো: আইন প্রয়োগে সদিচ্ছা আছে কি না? শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই নয়, বরং আইন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকাও অত্যন্ত জরুরি। আসলে কোনো কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। রাজনৈতিক সদিচ্ছাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আইন বাস্তবায়নের সদিচ্ছাকে প্রভাবিত করে।

আইন তো জনউন্নয়নের স্বার্থে; তা যদি কোনো জনগোষ্ঠীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা কোনো উন্নয়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় বলে ধারণা করা যায়, তাহলে তা বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখি, সারাদেশে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভূমিহীন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে পাকাঘর বানিয়ে দিতে যে কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হয়েছে, তা সম্পন্নের জন্য দেশের প্রচলিত ইট পোড়ানোকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা যায়নি। এভাবে প্রচলিত আইন প্রয়োগে ধীরে চলো নীতি জনকল্যাণের স্বার্থে হতে পারে। তবে সদিচ্ছার এই সাধারণ উদাহরণকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না।

আইন প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সদিচ্ছার অভাব কিংবা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইন বাস্তবায়নকারী সংস্থার আইন বাস্তবায়ন করা দুরূহ হয়ে পড়ে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা এখন একটা বড় প্রশ্ন: সঠিক সময়ে নিয়মমতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আইন প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে দক্ষতার অভাব আছে কি না? সমাজে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়। ছোটখাটো চুরি থেকে মারামারি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, ডাকাতি, জালিয়াতি, আবার মানব পাচার, সাইবার ক্রাইম, মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ বিভিন্ন মাত্রায় সংঘটিত হতে দেখা যায়।

সমাজে বিভিন্ন পর্যায়ে অপরাধীরা সুচতুরভাবে অপরাধকাজে নিয়োজিত থাকে। তারা সরকারের পাশাপাশি উন্নত সরঞ্জাম ও আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করে থাকে। তাই এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন প্রয়োগে দক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষায়িত জনবল এবং উন্নত যন্ত্র ও প্রযুক্তি না থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

সমাজে খুন, জখমসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মতো অপরাধ অতি সহজেই সকলের নজরে পড়ে, মিডিয়াতে ফলাও করে প্রকাশ হয়। তাই এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকবল স্বভাবতই তৎপর থাকতে দেখা যায়। কিন্তু যেসব অপরাধ সচরাচর লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে, যেমন দীর্ঘদিন ধরে গাছ কেটে বন উজাড় করা কিংবা অগোচরে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলা, সেসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা স্বভাবতই বেশি একটা নজর দিতে পারে না; দক্ষ জনবল না থাকার কারণে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বা দমনে ব্যর্থ হয়।

অপরাধ ছোট বা বড় যেমনই হোক এবং এসব অপরাধের কুফল দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান হোক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, তার জনবল ও তার প্রযুক্তিগত ব্যবহারের মাধ্যমে আইন প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে দক্ষ কি না তা পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার।

(চলবে…)

লেখক:

এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর স্ট্রাটিজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ 

সাবেক অতিরিক্ত সচিব। (পিআরএল), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/19026 ,   Print Date & Time: Tuesday, 6 October 2026, 03:18:56 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh