• হোম > অর্থনীতি | বাংলাদেশ | ব্যাংক > খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে, চাপে ব্যাংক খাত

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে, চাপে ব্যাংক খাত

  • সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৪৫
  • ২৫

---

ইবি রিপোর্ট

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে কোনো কোনো ব্যাংক মূলধন ও সংরক্ষণ ঘাটতিতে থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোথাও রয়েছে উদ্বৃত্ত তারল্য। এই চিত্রে অর্থের পাশাপাশি সুশাসন, আস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ের কাঠামোর দুর্বলতাও সামনে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ব্যাংক পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে।

২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৫.৭৩ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৩০.৬ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়ায়।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম মনে করেন, ব্যাংক খাতে শুধু নতুন মূলধন দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের কাঠামোও বদলাতে হবে। তার মতে, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ এখন মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হওয়ায় এর প্রভাব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের ওপর পড়ছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন। তার মতে, আমানতকারীর আস্থা নষ্ট হলে ব্যাংকের পাশাপাশি অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনের পাশাপাশি প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির পথ সচল রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার রোধে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’ সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। ঋণ আদায় দ্রুত করা এবং ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের চাপ কমানো এর লক্ষ্য। একই সঙ্গে নিষ্ক্রিয় আমানত ব্যবহার করে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ এবং এসএমই ও কৃষি খাতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদান ও কম সুদের ঋণের সমন্বয়ে তহবিল তৈরির উদ্যোগও রয়েছে।

ব্যাংক খাতের সংরক্ষণ ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২২ লাখ কোটি টাকা, যা ছয় মাস আগে ছিল ১.৯১ লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে ২০২৫ সালের শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ।

তবে ব্যাংক খাতকে পুরোপুরি তারল্য সংকটে থাকা বলা যাচ্ছে না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসএলআরের অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৪.৮৪ শতাংশ বেশি।

সিএসইআরের গবেষণায় বলা হয়েছে, দুর্বল ব্যাংকে নতুন মূলধন দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা, ঋণ মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ২০২৫ সালেই ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হলেও ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে শুধু পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

এ অবস্থায় দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদমান যাচাই, মূলধন পুনরুদ্ধারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং অটেকসই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ, হস্তান্তর বা অন্যান্য সংকট-সমাধান পদ্ধতি ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে পেশাদার কাঠামো এবং দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের কার্যকর বাজার গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকও মূলধনস্বল্প ব্যাংকের জন্য মূলধন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সুশৃঙ্খল পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের সামনে এখন শুধু মূলধন ঘাটতি পূরণের প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে আস্থা, সুশাসন, ঋণ আদায় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কারও জরুরি হয়ে উঠেছে।

খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির কারণ বন্ধ করা, মূলধন ক্ষয়ের কারণ চিহ্নিত করা এবং দুর্বল ব্যাংককে সহায়তার সঙ্গে সংস্কার ও জবাবদিহি যুক্ত করাই হতে পারে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের পরবর্তী ধাপ।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18948 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 03:39:33 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh