• হোম > মতামত > আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ: প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ: প্রাসঙ্গিক ভাবনা

  • সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১১
  • ৪০

---

ড. মোঃ আশফাকুল ইসলাম বাবুল 

সিরিজ: ১ম পর্ব

সম্প্রতি একটি সাধারণ প্রশ্ন সকলের মুখে মুখে: আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? যুগোপযোগী, জনকল্যাণকর আইন এবং তার সুষ্ঠু প্রয়োগ সমাজ ব্যবস্থাপনার অন্যতম নিয়ামক। কতটা পরিশ্রমের ফসলই না এই আইন! আইনের খসড়া প্রস্তুত থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জাতীয় সংসদে কোনো একটি আইন পাস হয়। অথচ তা প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে নানা বাধা ও জটিলতা দেখা দেয়। কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন থেকেও স্থান, কাল ও পাত্রভেদে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

উদাহরণ হিসেবে একদিকে পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা বিষয়ক কিছু আইন, অন্যদিকে বসবাসের লক্ষ্যে পরিকল্পিত গৃহায়ন ও নগরায়নের জন্য প্রণীত আইন বা নীতিমালা সহজেই চোখে পড়ে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহনসংক্রান্ত একটি আইন বাস্তবায়নের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এ আইনটি পাস করে তা বাস্তবায়নে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। শহরে অসহনীয় যানজট নিরসন, বেপরোয়া গাড়ি চলাচল রোধসহ পরিবহন ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে সড়ক পরিবহন বিষয়ক আইন সরকারপক্ষে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরোধিতায় দু-এক দিনের মধ্যে সে আইন কার্যকর করা স্থগিত করতে হয়েছে।

তাই কেন এসব আইন প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না, সে প্রশ্ন যৌক্তিক বলা যায়। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এসে যায়: আইনগুলো কি সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এতই সেকেলে, যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়? নাকি আইনগুলো বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতাজনিত ব্যর্থতা রয়েছে? নাকি এমন যে, আইনের সেবাভোগীদের নেতিবাচক মনোভাবই এসব আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগে অন্তরায়?

আজকের এ আলোচনায় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজব, তবে একটু ভিন্নভাবে—আরও কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে। আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে তিনটি বিষয়, যেমন—আইন নিজেই, আইনের প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আইনের সেবাভোগী সকল স্তরের জনসাধারণ—গুরুত্বপূর্ণ এবং পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। প্রতিটি বিষয়ে প্রশ্নভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে আইন বাস্তবায়নে যে বাধা বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, সে সম্পর্কে নিম্নে বর্ণনা করা হলো।

আইন

আইন জনসাধারণের কল্যাণে প্রণয়ন করা হয়। যে বিষয়ের ওপর আইন প্রণয়ন করা হবে, যেমন পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, সে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়—পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়—উক্ত বিষয়ে আইনের খসড়া প্রস্তুত করে। এরপর সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি দপ্তর বা সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে।

সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আইনটি উপযুক্ত বিবেচিত হলে তা জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের ভোটে পাস হয়। সরকার উক্ত আইন বাস্তবায়নে বিজ্ঞপ্তি আকারে তা প্রকাশ করে। নিঃসন্দেহে আইন প্রণয়নের এ প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিনের দক্ষ ব্যক্তি বা বিশেষজ্ঞদের সুনিপুণ কর্মকৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও মারাত্মক ভুল না থাকারই কথা। তারপরও এমন একটি আইন বাস্তবায়নে কেন এত অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে?

তাই সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে: আইনটি কি যুগোপযোগী নয়? বর্তমান যুগের চাহিদা বিবেচনা করে অর্থাৎ যুগোপযোগী করে প্রণয়ন করা হয়নি?

আইন হতে হবে সার্বজনীন; সকল স্তরের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা এখানে বিবেচ্য। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের অপরাধে সকলেই সমান সাজা পাবে—এটা যেমন সত্য, আবার অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় সাজার মাত্রা কম-বেশি হবে—এটুকু তারতম্যও আইনসিদ্ধ। কিন্তু একটি আইন শীতপ্রধান বড় অর্থনীতির দেশে উচ্চবিত্ত মানুষের ওপর প্রয়োগ করা গেলেও তা নাতিশীতোষ্ণ একটি ছোট অর্থনীতির দেশে হতদরিদ্র মানুষের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই আইন বাস্তবায়নের জটিলতা এলে প্রশ্ন আসবে: আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থান, কাল ও পাত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না?

নতুনকে আলিঙ্গন করতে কে না চায়?—হোক না তা নতুন গাড়ি বা বাড়ি কিংবা পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদ। কিন্তু কোনো আইন গ্রহণ বা মানতে মানুষের প্রতিক্রিয়া একটু ভিন্ন। অনেকদিনের লালিত প্রচলিত জীবনধারায় চলতে মানুষ অভ্যস্ত। সহজেই নতুন কোনো জীবনচর্চা গ্রহণ করতে চায় না। আর তার চলার পথে জোর করে নতুন কোনো নিয়মনীতি চাপিয়ে দিলে, যা তার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে চলাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, তা সে মেনে নেয় না।

তাই নতুন কোনো আইন এবং এর মাধ্যমে যে পরিবর্তন, তা সকলের নজরে আনতে আগে সে সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। নতুন আইন জারির আগাম প্রচারণা, জনসাধারণের এ আইনের ভালো-মন্দ বিবেচনার সময় দেওয়া এবং আইনের ধনাত্মক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ছোটখাটো কোনো নিয়মনীতি বাস্তবায়নের সময় যখন প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তখন এ প্রশ্ন আসবেই যে, আইন বাস্তবায়নে পূর্ব উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে কি না?

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এমন অনেক আইন আছে, যা প্রয়োগ করা হয় অ্যাপস বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে। আইন বাস্তবায়নের পূর্বে তার কার্যকারিতা প্রয়োজনমতো স্বল্প, দীর্ঘমেয়াদে বা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা আবশ্যক। তা না হলে আইন বাস্তবায়নকালে এর সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে আইনের গ্রহণযোগ্যতা হারায়, আইনের প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে আইনটি যতই ভালো হোক, মানুষ নতুনের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে চিরাচরিত ব্যবস্থাকেই ধরে রাখার দিকে থাকে। সে জন্য এ প্রশ্নেরও উত্তর জানা দরকার: আইন বাস্তবায়নের আগে এর কার্যকারিতা—স্বল্প, দীর্ঘ বা তাৎক্ষণিক—যাচাই করা হয়েছে কি না?

এ ছাড়া প্রতিটি আইনেরই একটা আইনি ব্যাখ্যা থাকতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে আইনের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, আইনের অধিক্ষেত্র, কে এ আইনে বিচার করবে, আইন অমান্য করলে বা আইনের অধীন অপরাধ সংঘটিত হলে কী সাজা হবে, কে বা কোন সংস্থা বিচারে প্রদত্ত নির্দেশ কার্যকর করবে এবং নির্দেশ প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া আইনের আওতায় কোনো ব্যক্তি কোনো কারণে সংক্ষুব্ধ হলে তা প্রতিকারের সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যাও থাকতে হবে।

প্রায়শই লক্ষ্য করা যায়, আইনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সুস্পষ্ট না থাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে আইনজীবীদের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উক্ত আইনের আওতায় বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করে কিংবা অন্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় আইনানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং কোনো আইন বাস্তবায়নের পূর্বে যাচাই হওয়া প্রয়োজন যে, আইনের সঙ্গে আইনের আইনি ব্যাখ্যা নিরূপণ করা হয়েছে কি না।

লেখক:

এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর স্ট্রাটিজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ

অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা

(চলবে…)


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18918 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 10:49:23 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh