![]()
ইবি রিপোর্ট
বিদেশি দাতা সংস্থার শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক ও নিজস্ব পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের দিকে যেতে চায় সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ঋণ কর্মসূচিতে কঠিন শর্ত থাকলে তা গ্রহণ করা হবে না।
রোববার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমীর খসরুর এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন আগের সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজের পরিবর্তে আইএমএফের কাছে চার থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের আলোচনা চলছে। গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি মিশন এ বিষয়ে ঢাকায় আসে। পরে মিশনটি ওয়াশিংটন ফিরে জানায়, নতুন ঋণ প্রস্তাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্কার শর্ত নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আইএমএফের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভর না করে আগের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। নতুন কর্মসূচিতেও কঠিন শর্ত থাকলে তা গ্রহণ করবে না সরকার।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাবো- এই ধারায় আমরা পরিবর্তন আনছি।’
দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ দাতাদের দেওয়া সীমিত ঋণের চেয়ে অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের প্রয়োজন বিলিয়ন ডলার। দাতাদের দেওয়া সীমিত অর্থ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন বিলিয়ন ডলার, যা আমরা আন্তর্জাতিক ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করছি। আন্তর্জাতিক এবং নিজস্ব পুঁজিবাজারকে কাজে লাগিয়ে নতুন আর্থিক কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।’
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের অর্থায়ন কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন আমীর খসরু। তাঁর মতে, বেসরকারি খাতের উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো প্রয়োজন। ব্যবসার মূলধনী খরচ কমানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে। তাই ব্যাংকনির্ভরতার পরিবর্তে পুঁজিবাজারমুখী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নেও নতুন পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, যমুনা সেতুর মতো বড় অবকাঠামোয় সিকিউরিটাইজেশনের দিকে যাচ্ছে সরকার।
বিমান কেনা কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে জনগণের করের অর্থ ব্যবহারের পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলেন তিনি।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উদ্ধার অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করে আমীর খসরু বলেন, অতীতে যথাযথ নীতি সহায়তা না থাকায় ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
এর ফলে ব্যাংকিং খাতে স্বল্পমেয়াদি আমানত ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বের হতে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থায় ফিরতে হবে বলে জানান তিনি। এতে ব্যবসার খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ওয়াল স্ট্রিটসহ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে নতুন করে আস্থা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য নিউইয়র্কে ‘ডলার বন্ড’, হংকংয়ে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড, পান্ডা ও সামুরাই বন্ড এবং স্থানীয় কারেন্সি বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন আমীর খসরু।
তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিএসইসি, আইডিআরএ (ইনস্যুরেন্স অথরিটি) এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে একসঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত ও স্বনিয়ন্ত্রিত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গণি এবং বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনসহ অর্থ খাত ও পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।