![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশের ব্যাংকিং খাতে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও লোকসান সামাল দিতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত সংস্কার রোডম্যাপ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৩ দফার এই পরিকল্পনায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ আদায় জোরদার, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ এবং একজন গ্রাহকের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ রাখা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি বিতরণ করা মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে পর্যালোচনা সভা করা হচ্ছে। সেখানে শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এ ছাড়া এসব ব্যাংকের জন্য ঋণ আদায় কৌশলসংক্রান্ত নির্দেশনা এবং ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ডের (আইএফআরএস) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি ভিত্তিক খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আইনি পর্যালোচনার পর সাধারণ ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হবে। ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের জন্য প্রণোদনা নীতিমালা সংশোধনের কথাও রয়েছে।
একজন গ্রাহক পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, সেই সীমা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় রিটের মাধ্যমে বাধা কমাতে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১,০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থায়নে প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনে আইনি সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও রয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা, বিপরীতে নিট লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। সর্বনিম্ন মূলধন শর্ত পূরণ করেছে ৪০টি ব্যাংক, আর ১৫টি ব্যাংক তা পূরণ করতে পারেনি।
চলতি বছরের মার্চ শেষে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংকটে থাকা ১২টি ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৯৪৫ দশমিক ৭১ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৫ হাজার ৮১০ দশমিক ৩২ কোটি এবং এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ দশমিক ২৫ কোটি টাকা।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক সমস্যায় থাকলেও সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে তারল্য ঘাটতি নেই। এসএলআর অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে ৭ লাখ ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।