• হোম > অর্থনীতি | বাংলাদেশ > চার বছরে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমেছে ২৩ শতাংশের বেশি

চার বছরে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমেছে ২৩ শতাংশের বেশি

  • রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৩৩
  • ২০

---

 

ইবি রিপোর্ট

চড়া বৈশ্বিক সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণ ২৩ শতাংশেরও বেশি কমে প্রায় ১৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এর চার বছর পর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সেই ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সুদহার বেড়ে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতার অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে আগের দায় পরিশোধের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে। বায়ার্স ক্রেডিট, বিলম্বিত আমদানি বিল পরিশোধ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধাসহ এই ঋণের পরিমাণ ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ৪২ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে। জুলাইয়ে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে।

২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬৮ শতাংশই ছিল স্বল্পমেয়াদি দায়। ওই সময় এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু চার বছর পর মোট ঋণ কমার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের অংশও নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে।

এই প্রবণতাকে ব্যবসায়ীদের পুরোনো ঋণ পরিশোধ এবং নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় ও চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে আগে যে পরিমাণ স্বল্পমেয়াদি বিদেশি অর্থায়ন ব্যবহৃত হতো, বর্তমানে তার ব্যবহার কমেছে।

স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ কমলেও একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালের শুরুতে বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ছিল ৪ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, হঠাৎ করে ঋণ পুনঃঅর্থায়ন বা মেয়াদ বাড়ানোর চাপ এড়াতে তারা এখন তুলনামূলকভাবে কাঠামোবদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। এতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের মতো ঘন ঘন পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন কমে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়ন তুলনামূলকভাবে পরিকল্পিতভাবে করা যায়।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, বিদেশি ঋণ বর্তমানে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এর সুদহার এখন ৭ থেকে ৮ শতাংশের ঘরে। তাঁর প্রতিষ্ঠান চলতি মূলধনের জন্য স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের পাশাপাশি ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি প্রকল্প ঋণও নিয়েছে।

তিনি বলেন, বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া এখনো চলছে। তবে ২০২০-২১ সালের তুলনায় বর্তমানে এ ধরনের ঋণ অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদহার নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক সোফর বা সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর সোফর রেট ছিল ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর আগে ২০২১ সালে এই হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশের কাছাকাছি।

২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে সোফর রেট বেড়ে ১ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। এর সঙ্গে বিদেশি ঋণদাতারা ক্রেডিট রিস্ক স্প্রেড যুক্ত করেন। পাশাপাশি বিদেশে পাঠানো সুদের ওপর ২০ শতাংশ উইথহোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয়। সব মিলিয়ে বিদেশি ঋণের প্রকৃত ব্যয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সুদের হার বৃদ্ধিই নয়, টাকার অবমূল্যায়নও বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে। কারণ ডলারে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে ব্যবসায়ীদের এখন আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ দেশীয় মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমার পেছনে বেশ কয়েকটি চাপ একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশ্বব্যাপী চড়া সুদহার বিদেশি ঋণের ব্যয় বাড়িয়েছে। অন্যদিকে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারভিত্তিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে দেশীয় মুদ্রায় ব্যয় বেড়েছে।

তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ডলার প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে বিদেশি ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলতে পারে। এর পরিবর্তে যেখানে সম্ভব, সেখানে আগের দায় পরিশোধের দিকে তারা ঝুঁকেছে।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ কমে যাওয়ার মধ্যে আমদানি ব্যয় মেটাতে ট্রেড ক্রেডিট ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবহার কমার বিষয়টিও প্রতিফলিত হতে পারে।

আমদানির বিল পরিশোধ কঠিন বা ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে দিতে কিংবা পিছিয়ে দিতে পারেন। একই সঙ্গে তারা দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়নের চেষ্টা করতে পারেন। ফলে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ট্রেড ক্রেডিট ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি দায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে এ খাতে ঋণ কমে যাওয়ার অর্থ শুধু ঋণ পরিশোধ নয়, এ ধরনের অর্থায়নের প্রবাহে পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।

বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়াকে সরাসরি অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার লক্ষণ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণ কমলে বৈদেশিক মুদ্রা ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি কমতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বরং এর পেছনে বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়া, অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতি কিংবা কম আমদানি ও উৎপাদনের মতো কারণও থাকতে পারে।

তাঁর মতে, মোট বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়ার অর্থ হতে পারে নতুন করে ঋণ নেওয়ার তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হয়েছে। তবে ঋণ কমার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে হলে নতুন ঋণ গ্রহণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ, ট্রেড ক্রেডিট এবং বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের বর্তমান চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার দ্রুত কমছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অংশ বাড়ছে। চড়া বৈশ্বিক সুদহার, ডলারের ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোবদ্ধ অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18851 ,   Print Date & Time: Sunday, 4 October 2026, 09:12:37 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh