
আহমেদ নাবিল দিপ
ব্যবসার জন্য টাকা পাওয়া যাচ্ছে না—সমস্যাটি এখন শুধু এতটুকু নয়। বাংলাদেশের উদ্যোক্তার সামনে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—ঋণ নিয়ে সেই টাকা কোথায় বিনিয়োগ করবেন, কীভাবে বিক্রি বাড়াবেন এবং কত দিনে টাকা ফেরত আসবে?
বিক্রি ধরে রাখা, নগদ অর্থের প্রবাহ, ঋণ, জ্বালানি ব্যয়, ক্রেতার চাহিদা, কর-ভ্যাট ও প্রতিযোগিতা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে ব্যবসায়ীদের।
অক্টোবরের শুরু থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়টি তাই উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যবসার ভিত পরীক্ষা করার সময়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে ছিল। টানা ছয় মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে। একই সময়ে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দুর্বল শিল্প উৎপাদন, ধীর বেসরকারি ঋণপ্রবাহ এবং ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা বলেছে।
এর সঙ্গে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর অক্টোবরের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে উদ্যোক্তারা অক্টোবর শুরু করছেন বাড়তি জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের বাস্তবতায়।
অর্থাৎ আগামী এক মাসে উদ্যোক্তার লড়াই শুধু বিক্রি বাড়ানোর নয়। টাকা, খরচ, চাহিদা ও নগদ প্রবাহ—এই চারটি হিসাব একসঙ্গে সামলানোই হবে বড় পরীক্ষা।
ঋণের সংকটের চেয়েও বড় সংকট ঋণের চাহিদা
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির একটি ভিন্ন দিকও আছে। ব্যাংকে অর্থ থাকলেও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুনে এটি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা দুর্বল ব্যবসায়িক চাহিদা, কম বিনিয়োগ, ধীর অভ্যন্তরীণ ভোগ এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপকে ঋণপ্রবাহ কম থাকার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এখানে উদ্যোক্তার জন্য বার্তাটি পরিষ্কার। আগামী এক মাসে নতুন ঋণ নেওয়ার আগে শুধু সুদের হার নয়, ঋণটি কত দ্রুত আয় তৈরি করবে সেটি হিসাব করতে হবে। কারণ বিক্রি দুর্বল থাকলে ঋণের টাকা ব্যবসায় ঢুকবে, কিন্তু সেই টাকা থেকে আয় তৈরি হতে দেরি হবে। তখন কিস্তি ও সুদের চাপ ব্যবসার নগদ প্রবাহে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ছোট ব্যবসার জন্য অর্থায়নের দরজা এখনো সংকীর্ণ
সিএমএসএমই খাতের অর্থায়ন পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিএমএসএমই খাতের বকেয়া ঋণ ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ কমে ২ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। একই সময়ে মোট ব্যাংকঋণে এ খাতের অংশ ছিল ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
আর এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ সিএমএসএমই উদ্যোক্তার ৭৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক ঋণের বাইরে রয়েছেন। সরাসরি ব্যাংকঋণ পান মাত্র ৯ শতাংশ।
এ তথ্যগুলো বলছে, উদ্যোক্তার সমস্যা শুধু ঋণের সুদ নয়। ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক তথ্য, হিসাব, জামানত, নগদ প্রবাহের প্রমাণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দেখানোও অর্থায়নের অংশ। তাই আগামী এক মাসে উদ্যোক্তার প্রস্তুতির একটি বড় জায়গা হওয়া উচিত হিসাবপত্র গোছানো।
জ্বালানি ব্যয় এখন আর সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়, বাস্তব খরচ
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত উদ্যোক্তারা জ্বালানি দামের ঝুঁকি নিয়ে হিসাব করছিলেন। এখন সেটি বাস্তব ব্যয়ে পরিণত হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অক্টোবরেও এসব দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
এর প্রভাব শুধু পরিবহন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়। কাঁচামাল আনা, পণ্য কারখানা থেকে বাজারে নেওয়া, পণ্য সরবরাহ, জেনারেটর চালানো—বিভিন্ন জায়গায় জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়কে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে আগামী এক মাসে উদ্যোক্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—বাড়তি খরচের কতটা নিজের লাভ থেকে বহন করবেন এবং কতটা পণ্যের দামে সমন্বয় করবেন?
ক্রেতার হাতে টাকা থাকলেও ব্যয়ের ধরন বদলাতে পারে
মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে—এটি আগের তুলনায় স্বস্তির খবর। কিন্তু এর অর্থ পণ্যের দাম কমে গেছে, এমন নয়। বরং দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বলছে, আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমলেও সরবরাহ ও ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি রয়েছে।
উদ্যোক্তার জন্য এর অর্থ হলো, ক্রেতা আগের মতো একই পণ্য একই পরিমাণে নাও কিনতে পারেন। কেউ কম দামের পণ্যে যেতে পারেন। কেউ কেনাকাটা পিছিয়ে দিতে পারেন। আবার একই পণ্যের ছোট প্যাকেজ বেছে নিতে পারেন। তাই আগামী ৩০ দিনে শুধু মোট বিক্রি দেখলে হবে না। কোন পণ্য দ্রুত বিক্রি হচ্ছে, কোন পণ্যে লাভ বেশি এবং কোন পণ্যে টাকা আটকে আছে—এসব আলাদা করে দেখতে হবে।
নগদ অর্থই হতে পারে ব্যবসার আসল পরীক্ষা
ব্যবসা লাভ করছে কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তার জন্য আরেকটি প্রশ্ন অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ: হাতে টাকা আছে কি না।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান ১০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। কিন্তু তার ৭ লাখ টাকা ক্রেতার কাছে পাওনা। এদিকে কর্মচারীর বেতন, ভাড়া, সরবরাহকারীর বিল এবং ব্যাংকের কিস্তি দিতে হবে। কাগজে ব্যবসা লাভজনক হলেও হাতে নগদ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি সমস্যায় পড়তে পারে।
এই কারণে আগামী এক মাসে উদ্যোক্তাদের অন্তত ৩০ দিনের নগদ প্রবাহের হিসাব করা দরকার। কোন তারিখে কত টাকা আসবে, কত টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং কোথায় টাকা আটকে আছে—এসব হিসাব ব্যবসার সিদ্ধান্তে সরাসরি কাজে লাগবে।
১৫ অক্টোবর: কর-ভ্যাটের গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা
অক্টোবরে উদ্যোক্তাদের আরেকটি প্রশাসনিক চাপ হলো ভ্যাট রিটার্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জুলাই ও আগস্ট ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন জমার সময় ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর কর মেয়াদের রিটার্ন ১৫ অক্টোবরের মধ্যে ই-ভ্যাট ব্যবস্থায় জমা দিতে হবে। নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে জমা দিলে সংশ্লিষ্ট জুলাই ও আগস্ট মেয়াদের রিটার্নের ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপ করা হবে না।
তাই উদ্যোক্তার জন্য হিসাবরক্ষণ এখন আর শুধু হিসাবরক্ষকের বিষয় নয়। বিক্রি, ক্রয়, ভ্যাট ও ব্যাংক লেনদেনের নথি ঠিকভাবে রাখা ব্যবসার নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিযোগিতার বাজারে শুধু কম দাম দিয়ে টিকে থাকা যাবে না । অর্থনৈতিক চাপের সময়ে উদ্যোক্তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে দাম কমানো। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেটি কার্যকর সমাধান নয়। কারণ দাম কমালে বিক্রি বাড়লেও লাভ কমতে পারে। আবার দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যেতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতার জায়গাটি এখন শুধু দামের নয়। পণ্যের মান, সরবরাহের সময়, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, বিক্রয়োত্তর সেবা, অনলাইন উপস্থিতি এবং নির্ভরযোগ্যতা—সবকিছু মিলে একজন উদ্যোক্তার বাজার তৈরি হচ্ছে।
সুযোগও আছে: ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেপ্টেম্বর মাসে ‘উদ্যোগ—উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ চালু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই ও বিশেষ কর্মসূচি বিভাগ এ বিষয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর সার্কুলার জারি করেছে।
কর্মসূচিতে যোগ্য নির্বাচিত উদ্যোক্তার ব্যবসার প্রয়োজন ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হতে পারে।
আবেদনের শেষ সময় ১৫ অক্টোবর। তবে এটি নিশ্চিত অর্থায়ন নয়; নির্ধারিত যোগ্যতা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে। অর্থাৎ অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও উদ্যোক্তার প্রস্তুতি থাকতে হবে—ব্যবসার ধারণা, আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্ভাব্য বাজার, অর্থের ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরিষ্কারভাবে দেখানোর।
আগামী ৩০ দিনে উদ্যোক্তার পাঁচটি হিসাব
আগামী এক মাসে ব্যবসার সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোক্তাদের অন্তত পাঁচটি হিসাব নিয়মিত দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, নগদ প্রবাহ। আগামী ৩০ দিনে কত টাকা আসবে এবং কত টাকা বের হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত লাভ। মোট বিক্রি নয়, সব খরচ বাদ দেওয়ার পর কত টাকা থাকছে। তৃতীয়ত, ঋণের সক্ষমতা। নতুন ঋণের কিস্তি ব্যবসার মাসিক নগদ প্রবাহের কত অংশ নিয়ে নেবে। চতুর্থত, পণ্যের চাহিদা। কোন পণ্য দ্রুত বিক্রি হচ্ছে এবং কোন পণ্যে মূলধন আটকে আছে। পঞ্চমত, বাধ্যতামূলক ব্যয়। কর, ভ্যাট, বেতন, ভাড়া, বিদ্যুৎ, ঋণ ও সরবরাহকারীর পাওনা—কোনটি কখন পরিশোধ করতে হবে। সামনে প্রকৃত প্রশ্ন: ব্যবসা কতটা স্থিতিশীল?
অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে উদ্যোক্তাদের সামনে বড় কোনো একক সমস্যা নেই। বরং কয়েকটি মাঝারি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে—দুর্বল ঋণপ্রবাহ, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয়, সীমিত চাহিদা, অর্থায়নের বাধা এবং প্রশাসনিক নিয়ম।
বাংলাদেশ ব্যাংক একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ভারসাম্যের কথা বলছে। কিন্তু আগস্টের ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, ব্যবসায়িক অর্থায়ন ও বিনিয়োগের গতি এখনো দুর্বল।
এই পরিস্থিতিতে আগামী ৩০ দিনের জন্য উদ্যোক্তার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে বড় হওয়ার আগে ব্যবসার ভিত পরীক্ষা করা। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে হিসাব করা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, দ্রুত বিক্রি হয় এমন পণ্যে মূলধন রাখা, পাওনা টাকা দ্রুত আদায় করা, কর-ভ্যাটের নথি ঠিক রাখা এবং হাতে পর্যাপ্ত নগদ রাখা—এসব ছোট সিদ্ধান্তই ব্যবসার স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করতে পারে।