
ইবি রিপোর্ট
জ্বালানির দামে বড় ধরনের বৃদ্ধির প্রভাবে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিন বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল, এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের প্রাথমিক হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ইউরোজোনে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর এটিই সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
বর্তমানে ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানির দাম।
সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে এ বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। শুধু আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
ইউরোজোনের ভোক্তা মূল্যসূচকে জ্বালানির হিস্যা প্রায় ৯ শতাংশ। ফলে এ খাতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও পড়েছে। হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট এসেছে জ্বালানি থেকে।
তবে জ্বালানি, খাদ্য, অ্যালকোহল ও তামাক বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক কম বেড়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসেও এ হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল।
সেবা ও খাদ্যপণ্যে মূল্যবৃদ্ধি
সেপ্টেম্বরে ইউরোজোনে সেবা খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৩ শতাংশ। ভোক্তা মূল্যসূচকে সেবা খাতের অংশ প্রায় ৪৭ শতাংশ। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়া, রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ ও বীমার মতো বিভিন্ন খাত রয়েছে।
খাদ্য, অ্যালকোহল ও তামাকের দামও বেড়েছে। আগস্টে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রক্রিয়াজাত নয় এমন খাদ্যপণ্যের দাম তুলনামূলক দ্রুত বেড়েছে। তাজা ফল, সবজি ও মাংসের মতো পণ্যে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানি ছাড়া শিল্পপণ্যের দামে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। গাড়ি, পোশাক ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির মতো পণ্যের দাম সেপ্টেম্বরে ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ১ দশমিক ২ শতাংশ।
দেশভেদে মূল্যস্ফীতিতে পার্থক্য
সেপ্টেম্বরে ইউরোজোনের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে লিথুয়ানিয়ায়, ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আগস্টে দেশটির মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
বুলগেরিয়ায় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি ইউরো চালু করা দেশটিতে এ হার রেকর্ড করা হয়েছে। সাইপ্রাস ও লুক্সেমবার্গে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ করে। গ্রিসে ৫ দশমিক ১ এবং স্পেনে ৫ শতাংশ।
ইউরোজোনের ২১টি দেশের মধ্যে ছয়টি দেশে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ বা তার বেশি হয়েছে। ১০টি দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ইউরোজোনের গড় ৩ দশমিক ৮ শতাংশের সমান বা বেশি।
সবচেয়ে কম মূল্যস্ফীতি হয়েছে মাল্টায়, ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ফিনল্যান্ডে তা ছিল ২ দশমিক ৬ এবং লাটভিয়ায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি কমেছে শুধু লাটভিয়ায়।
ইউরোজোনের চার বড় অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ইতালিতে ৩ দশমিক ২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। ফ্রান্সে ২ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, জার্মানিতে ২ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং স্পেনে ৪ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৫ শতাংশ হয়েছে।
সুদহার নিয়ে নতুন চাপ
মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি ইসিবির সুদহার নীতি নিয়ে নতুন চাপ তৈরি করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ইসিবি সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়েছে। এতে আমানতের সুদহার বেড়ে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। ২০২৬ সালে এটি ছিল ইসিবির দ্বিতীয় দফা সুদহার বৃদ্ধি। এর আগে জুনেও ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছিল।
সুদহার বাড়লে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ে। এর ফলে ব্যয় ও বিনিয়োগ কমতে পারে। সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
ইসিবি গত সেপ্টেম্বরে ২০২৬ সালের গড় মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। ২০২৭ সালে তা ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮ সালে ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।