• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > বন্ধ কারখানা চালুর ২০ হাজার কোটি টাকার স্কিমে ধীরগতি

বন্ধ কারখানা চালুর ২০ হাজার কোটি টাকার স্কিমে ধীরগতি

  • বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৬
  • ১৪

---

ইবি রিপোর্ট

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে এখনো গতি আসেনি। চার মাস পার হলেও এই তহবিল থেকে ঋণ ছাড় হয়েছে মাত্র ১১০ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে স্কিম ঘোষণার পর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৮০০ কোটি টাকার ঋণের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১১০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।

এই ধীরগতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ঋণের ক্রেডিট ঝুঁকি। বাংলাদেশ ব্যাংক কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ দিলেও ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে দায় বহন করতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংককেই। আবেদনকারীর ব্যবসা কতটা কার্যকর এবং প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে টিকে থাকতে পারবে কি না, সেটিও ব্যাংকগুলোকেই যাচাই করতে হচ্ছে।

বর্তমান নিয়মে ঋণপ্রত্যাশী প্রতিষ্ঠান প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে আবেদন করে। ব্যাংক নিজস্ব মূল্যায়নের মাধ্যমে উপযুক্ত মনে করা আবেদনগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায় অর্থায়নের জন্য।

তবে তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, অডিটের পর প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করায় প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানাকে তারা এই স্কিমের জন্য প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে। কিন্তু সংগঠনটির দাবি, এখন পর্যন্ত এসব কারখানার কোনোটি তহবিল পায়নি।

বিজিএমইএ-এর সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, “আমাদের জানা মতে, এই স্কিমের অধীনে এপর্যন্ত একটি কারখানাও ফান্ড পায়নি।” টিবিএস-এর সঙ্গে আলাপকালে চারজন কারখানা মালিকও জানিয়েছেন, তারা এখনো অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব তহবিলে মোট ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে। বিভিন্ন স্কিম মিলিয়ে বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

গত ২৩ মে চালু করা ৬০ হাজার কোটি টাকার সামগ্রিক প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য ছিল বন্ধ কারখানা চালু, স্থবির রপ্তানি কার্যক্রম পুনরুজ্জীবন এবং সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মতো সুদে ঋণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছিলেন, এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। মোট বরাদ্দের ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়নের জন্য রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১৯,০০০ কোটি টাকা।

ব্যাংকাররা বলছেন, কম সুদের অর্থ পাওয়া গেলেও ঝুঁকি এড়ানোর বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “ঋণের ঝুঁকি যদি বেশি হয়, তবে চূড়ান্ত দায়ভার আমাদের ব্যালেন্স শিটের ওপরই এসে পড়ে। বন্ধ কারখানাগুলো মূলত অকার্যকর বা ব্যর্থ প্রকল্প। ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তবসম্মত রূপরেখা ছাড়া ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না।”

অপর এক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার জানান, উচ্চ ঝুঁকির প্রকল্পে অর্থায়নের পরিবর্তে ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে নিশ্চিত রিটার্ন বা মুনাফা পেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

গত ৫ জুন গঠিত তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় চালুর জন্য তারল্য সহায়তা দেয়। ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে। নিয়মিত কিস্তি শুরুর আগে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। তহবিল প্রাপ্যতা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য ঋণের মেয়াদ এক বছর। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের সর্বোচ্চ ঋণসীমা ২০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এই সতর্কতা ইচ্ছাকৃত ও প্রয়োজনীয়। তাঁর ভাষায়, “বন্ধ কারখানায় ঋণ দেওয়া আমাদের জন্য একটি আনটেস্টেড (অপরীক্ষিত) মডেল। যেহেতু এখানে জনগণের আমানতের টাকা জড়িত, তাই আবেদনকারীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগছে। আমরা ইচ্ছেকৃত খেলাপি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি—এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধা দেব না। শুরুতে অগ্রগতি কিছুটা ধীরগতির হলেও, যোগ্য আবেদনগুলো অনুমোদিত হলে এর গতি বাড়বে।”

অন্যদিকে কিছু ব্যাংক নতুন ঋণের আগে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, অতিরিক্ত জামানত বা নতুন মূলধন আনার শর্ত দিচ্ছে। ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন জানান, তাদের ব্যাংক কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রস্তাব তৈরি করেছে। তবে বকেয়া সমন্বয়ে অতিরিক্ত জামানত বা নিজস্ব সম্পদ বিক্রির শর্ত রয়েছে।

তিনি আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ব্যাংক এশিয়ার দায় মেটাতে প্রতিষ্ঠানটি আবুল খায়ের গ্রুপের কাছে সম্পদ বিক্রি করেছিল। নতুন ইকুইটি যুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর অবস্থায় এসেছে। বেঙ্গল প্লাস্টিকও নির্মাণাধীন সুইস টাওয়ার বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেছে। এতে ব্যালেন্স শিটের উন্নতি হওয়ায় ব্যাংক এশিয়া কম খরচের পুনঃঅর্থায়ন অনুমোদন করতে পেরেছে।

সোহেল বলেন, “এটি উভয় পক্ষের জন্যই একটি উইন-উইন পজিশন তৈরি করেছে।” সিটি গ্রুপের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কোম্পানিটিকে আগে সম্পদ বিক্রি করে নিজস্ব মূলধন বা ইকুইটি আনতে হবে। শুধু ব্যাংকের ঋণে তাদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”

এদিকে পোশাক খাতের সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত অর্থায়ন না পেলে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছে। নওফস গার্মেন্টস লিমিটেড দুই মাস আগে উত্তরা ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা শাখায় ২৫ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করেও অনুমোদন পায়নি।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর ইসলাম বলেন, “যদি এই লোন ছাড় না হয়, তাহলে আমাদের শ্রমিকদের বেতন দিতে না পারার মতো ঝুঁকি তৈরি হবে এবং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে।”

বার্ষিক ১২০ কোটি টাকার রপ্তানি ও ৮৫০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ওপর লেনদেন নিষেধাজ্ঞায় ব্যাহত হয়। এলসি খোলা ও রপ্তানি আয় প্রক্রিয়াকরণে ছয় সপ্তাহ বিলম্বে সাপ্লাই চেইনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। এখন নতুন রপ্তানি আদেশ ফিরলেও নগদ মূলধনের সংকটে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ক্লাসিক্যাল ফ্যাশন লিমিটেডও উত্তরা ব্যাংকের লালদীঘি শাখার মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়নের আবেদন করেছে। শতভাগ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ৬৫০ থেকে কমে ১৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। ৪৫০টি সেলাই মেশিনের মধ্যে চালু রয়েছে ১২০টি।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, “ব্যাংক কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এখনো কোনো তহবিল বা নির্দেশনা পাননি।” তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18722 ,   Print Date & Time: Thursday, 1 October 2026, 11:28:56 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh