• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | বাংলাদেশ | ব্যাংক > মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকায় নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশেই রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থাকায় নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশেই রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

  • বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৪
  • ২৮

---

 

ইবি রিপোর্ট

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। এ কারণে চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে সতর্ক অবস্থান নিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। এ সময় ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

তিনি জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই বহাল থাকছে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কয়েকটি কারণ সামনে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার সম্ভাব্য প্রভাব, দেশে জ্বালানির নিয়ন্ত্রিত মূল্যের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ অবস্থায় আগেভাগে মুদ্রানীতি আরও শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে আসার কারণেই সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে।

ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। এর সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মুদ্রানীতিতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।

ওই সময়ে শিল্প উৎপাদনও শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির মতো সূচকগুলো গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। তবে উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত সব বাধা দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারও করতে হবে।

মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করার পর আর্থিক বাজারে স্বস্তির কিছুটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। এরপর আন্তঃব্যাংক সুদহার ও সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ডও কমেছে।

তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও বিতরণ এখনো দুর্বল। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বিনিয়োগে ধীরগতি, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের (বিওপি) উদ্বৃত্ত ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূলত আর্থিক হিসাবের ঘাটতির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছে। তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে ভিন্নতা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে এর গতি কতটা হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সতর্ক মুদ্রানীতি পরিচালনার দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18648 ,   Print Date & Time: Thursday, 1 October 2026, 06:58:35 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh