
ইবি রিপোর্ট
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিকল্প হিসেবে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা সোডিয়াম দিয়ে ব্যাটারি তৈরি করা যায়। এমনকি উৎপাদনে সমুদ্রের পানির লবণও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণে লিথিয়ামের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। খবর এফটি।
লিথিয়াম তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং এর কাঁচামালও সীমিত। বিপরীতে সোডিয়াম সহজলভ্য হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লিথিয়ামের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার বাড়ছে।
তবে নতুন এই প্রযুক্তির উৎপাদন, পেটেন্ট ও বিনিয়োগে পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে গেছে চীন। ভোল্টা ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তির পেটেন্ট কার্যক্রমে চীন ছিল শীর্ষে। সবচেয়ে বেশি পেটেন্ট আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল চীনের সিএটিএল।
ব্যাটারি শিল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, চীনে চালু ও পরিকল্পনাধীন সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কারখানাগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪০০ গিগাওয়াট ঘণ্টার বেশি। চীনের বাইরে বিশ্বের বাকি দেশগুলোয় এ সক্ষমতা মাত্র ১১ গিগাওয়াট ঘণ্টা।
ব্যাটারি শিল্পের ব্যয়বিষয়ক পরামর্শক সিআরইউ গ্রুপের প্রধান ম্যাক্স রিড বলেন, ‘সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে প্রথম হওয়ার সুযোগ পশ্চিমা দেশগুলো হারিয়ে ফেলেছে। বড় পরিসরে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিটি কারখানায় ১০ কোটি ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু চীনের বাইরে এ ধরনের বিনিয়োগ এখনো খুব কম।’
সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তি নিয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টার্টআপও একসময় আশাবাদী ছিল। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই অগ্রগতি দেখা যায়নি।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্রাফাইট ও কোবাল্টের মতো উপাদানের উৎপাদনে চীনের বড় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সোডিয়ামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। উপাদানটি তুলনামূলক সহজলভ্য এবং সমুদ্রের পানিও এর সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।
এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে চীনা কোম্পানিগুলো দ্রুত এগিয়েছে। দেশটির ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএল এবং গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি এ খাতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সরকারি করছাড়সহ বিভিন্ন সহায়তাও চীনা কোম্পানিগুলোর অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।
শুধু ইভি নয়, বিদ্যুৎ সংরক্ষণেও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সম্ভাবনা বাড়ছে। দ্রুত চার্জ গ্রহণ এবং তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ার কারণে এ খাতে এর ব্যবহার বাড়তে পারে। ডেটা সেন্টারেও প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে। কম্পিউটিংয়ের সময় হঠাৎ বিদ্যুতের প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যাকআপ দেওয়ার সক্ষমতা সেখানে প্রয়োজন।
পশ্চিমা দেশগুলোর কিছু কোম্পানি এখনো সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতা জেনারেল মোটরস বা জিএম এ প্রযুক্তির ব্যাটারি তৈরিতে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক পিক এনার্জির সঙ্গে কাজ করছে। তবে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর অনেককেই এখনো এশিয়া, বিশেষ করে চীন থেকে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল আমদানি করতে হয়। পিক এনার্জিও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় এশীয় ও চীনা সেল ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।
জিএমের ব্যাটারি ব্যবসার প্রধান কার্ট কেল্টি বলেন, ‘উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় উপাদান উত্তর আমেরিকা থেকেই সংগ্রহ করা হবে।’
এদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্টার্টআপ এ প্রযুক্তিতে অর্থ বিনিয়োগ করলেও সবাই টিকে থাকতে পারেনি। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ন্যাট্রন এনার্জি গত বছর বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে একটি গিগাফ্যাক্টরি নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। একইভাবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্পিনআউট প্রতিষ্ঠান বেডরক ম্যাটেরিয়ালসও কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ চীনের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় এখনো অনেক ছোট। উৎপাদনের পাশাপাশি গবেষণা ও পেটেন্টের ক্ষেত্রেও চীন এগিয়ে রয়েছে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিকল্প হিসেবে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে চীনের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও সামনে আসছে।