• হোম > অর্থনীতি > প্রকল্পের ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তেল আমদানিতে ব্যবহার

প্রকল্পের ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তেল আমদানিতে ব্যবহার

  • বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৫৭
  • ১১

---

ইবি রিপোর্ট

 পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাবে থাকা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বা ইআরএল-২সহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করে গত সাত মাসে জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য তৈরি বিপিসির কার্যপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রকল্প খাত থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যবহার করেছে সংস্থাটি। ফলে যেসব প্রকল্পের হিসাব থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে বিপিসি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পগুলোর হিসাবে থাকা অর্থ বিপিসির নিজস্ব অর্থ। বিভিন্ন প্রকল্পে চলতি ও আগামী অর্থবছরে কখন কত টাকা প্রয়োজন হবে, সেই হিসাব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের কাজে কোনো প্রভাব পড়বে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাবে রাখা অর্থ বিপিসিরই। প্রকল্পগুলোতে চলতি ও আগামী অর্থবছরে কখন কত টাকা লাগবে, সেই প্রয়োজন বিবেচনা করে অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে অর্থ নেওয়া হয়নি।”

বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, লোকসানের মধ্যেও জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রাখা সংস্থাটির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থের ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি জানান।

ছয় মাসে লোকসান ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপিসিকে দুই মাসের তেলের মূল্যের সমপরিমাণ ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রির কারণে সংস্থাটির চলতি মূলধন কমেছে।

বিপিসির হিসাবে, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে তাদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এই লোকসানের বড় অংশ এসেছে ডিজেল থেকে।

বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ডিজেল। কার্যপত্র তৈরির সময়কার আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ডলারের বিনিময় হার ধরে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা পড়ছিল। তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল লিটারে ১১৫ টাকায়।”

বিপিসির কার্যপত্র অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৮৬ ডলার। মার্চে তা বেড়ে ১৮৬ দশমিক ৫৯ ডলার হয়। এপ্রিলে সর্বোচ্চ দাম ব্যারেল প্রতি ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে ওঠে। সেপ্টেম্বরে কার্যপত্র তৈরির সময় পর্যন্ত গড় দাম ছিল ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলার।

সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পর ডিজেলের খরচ ওঠার পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি দাম হতে হবে ১১০ ডলার। ফলে বর্তমান মূল্যেও বিপিসিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

পাঁচ মাস বাড়েনি জ্বালানি তেলের দাম

দেশে ২০২৪ সালের মার্চে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছিল।

তবে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও জনস্বার্থে প্রায় পাঁচ মাস দেশে দাম বাড়ানো হয়নি। পরে ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়।

এরপর ১ জুন কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা করা হয়। ডিজেলের দাম রাখা হয় ১১৫ টাকা। সবশেষ ২১ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিপিসি জানিয়েছে, লোকসান কমানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি কমাতেও সর্বশেষ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে পাচারের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ চিহ্নিত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন বিপিসি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম।

দাম বাড়ার পর সংকট কাটার ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিটি

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে জ্বালানি সংকট তৈরির কারণ নিয়ে মঙ্গলবারের বৈঠকে আলোচনা হয়। সংকটের সময় ও পরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা একই থাকার পরও শুধু দাম বাড়ানোর ফলে কীভাবে সংকটের অবসান হলো, সে বিষয়ে বিপিসির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি।

তবে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “এটি কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। মূলত বিপিসি ও এর কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম, বর্তমান প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”

বর্তমান জ্বালানি চাহিদা, সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে পরবর্তী বৈঠকে বিস্তারিত তথ্য দিতে বিপিসিকে সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে জনগণের জন্য জ্বালানির দাম সহনীয় রাখতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে নেওয়ার পরিকল্পনা

বর্তমানে বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর ৬৪টি ডিপো ও স্থাপনায় ১৬ লাখ ২৭৩ টন জ্বালানি তেল মজুদের সক্ষমতা রয়েছে। এই সক্ষমতার মাধ্যমে পণ্যভেদে ৪০ থেকে ৪৫ দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে বিপিসি।

এই মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য মোট বিনিয়োগের অঙ্ক এখনও নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বিপিসি চেয়ারম্যান।

রফিকুল ইসলাম বলেন, “মোট বিনিয়োগের অঙ্ক এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। বিপিসি কেন্দ্রীয়ভাবে সব অবকাঠামো নির্মাণ করবে না। আওতাধীন কোম্পানিগুলো নিজেদের বাজেটে মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে। সব কোম্পানির পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তা পরে নির্ধারণ করা হবে।”

এ বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে সংসদীয় কমিটিকেও তথ্য দেওয়া হবে বলে জানান বিপিসি চেয়ারম্যান।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18570 ,   Print Date & Time: Wednesday, 30 September 2026, 11:34:21 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh