
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘ ২৩ বছর পর ইরাক থেকে নিজেদের পূর্ণাঙ্গ সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের শেষ দলটি বুধবার ঘাঁটি ছাড়ছে। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
মার্কিন সেনাদের এই প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা ‘বিজয়’ হিসেবে দেখছে। তবে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক বিবৃতিতে এর আগে জানানো হয়েছিল, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে সব বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ১ অক্টোবর থেকে দেশটিতে আর কোনো বিদেশি সেনা অবস্থান করবে না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক অভিযানেরও সমাপ্তি ঘটছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রতি সম্মান রেখে অর্থনীতি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দেবে।
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সূচনা হয় ২০০৩ সালে। ওই বছরের ১৯ মার্চ ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
অভিযান শুরুর প্রায় নয় মাস পর সাদ্দাম হোসেন গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তবে সাদ্দাম সরকারের পতনের পরও ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত ছিল। ২০১১ সালের শেষ দিকে এক দফায় মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই আবার দেশটিতে মার্কিন বাহিনী ফিরে আসে।
এর পেছনে বড় কারণ হয়ে ওঠে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থান। ২০১৪ সালে আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এরপর জঙ্গিগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট আবার ইরাকে সক্রিয় হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হচ্ছিল। সর্বশেষ বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ সেনা অবস্থান করছিলেন। বুধবার তাদের শেষ দলটিও ইরাক ছাড়ছে।
ইরাকে দীর্ঘ সময়ের সামরিক উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়েছে। এর মধ্যে ছিল প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহসহ নানা ধরনের সহায়তা।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে ইরাকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে বিদেশি সেনাদের পূর্ণ প্রত্যাহারকে দেশটির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের শূন্যতা বিপজ্জনক হতে পারে। গত দুই দশকে ইরাক এমন পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকার একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। তবে এর অর্থ ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যকার সম্পর্ক শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে অর্থনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।
মার্কিন সেনাদের বিদায়কে ইরাকের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং ইসলামিক স্টেটের সম্ভাব্য পুনরুত্থান নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে।
ফলে দীর্ঘ ২৩ বছর পর ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলেও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন একটি পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। সামরিক সহযোগিতার পরিবর্তে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক স্বার্থকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে দুই দেশের।