• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > ইন্টারকন্টিনেন্টালের ৮৮৪ কোটি টাকার ঋণের দায় নেবে সরকার

ইন্টারকন্টিনেন্টালের ৮৮৪ কোটি টাকার ঋণের দায় নেবে সরকার

  • বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:২৩
  • ২১

---

ইবি রিপোর্ট

বছরের পর বছর লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার ঋণের দায় এবার নিচ্ছে সরকার। হোটেলটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) অগ্রণী ব্যাংকের কাছে চূড়ান্ত দেনা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা। এই অর্থ বিএসএলের পক্ষে সরকার পরিশোধ করবে।

তবে সরকার যে অর্থ অগ্রণী ব্যাংককে দেবে, তার একটি অংশ পরে বিএসএলের কাছ থেকে আদায় করা হবে। এ জন্য করপোরেট সুকুক, বন্ড ও ইকুইটি ইস্যুর মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে বিএসএল। অবশিষ্ট ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে প্রতিষ্ঠানটি।

একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা বিএসএলের সম্পদ দায়মুক্ত করার ব্যবস্থা নেবে সরকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এখনো বাজেট থেকে অর্থ ছাড় করা হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএসএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভূঁঞা ঋণ পরিশোধের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করার জন্য আগে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপের (আইএইচজি) সঙ্গে করা ৩০ বছর মেয়াদি পরিচালনা চুক্তির আওতায়। ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ব্র্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অর্জনের জন্য মূল অবকাঠামো রেখে হোটেলটির ভৌত, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ও সাজসজ্জাসহ বিভিন্ন সুবিধা আধুনিকায়ন করা হয়। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চলে সংস্কারকাজ।

এই সংস্কারের জন্য অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫৭৪ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ঋণ নেয় বিএসএল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে চালু হওয়ার পরও হোটেলটি মুনাফায় ফিরতে পারেনি। লোকসানের কারণে ঋণের অর্থও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ব্যয়ের কারণে সরকার বর্তমানে আর্থিক চাপে রয়েছে। ফলে এ ধরনের খাতে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিত। তবে অগ্রণী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠাকে দেওয়া ঋণের অর্থ ফেরত পাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে ঋণের দায় নেওয়ার পথে যেতে হচ্ছে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ইন্টারকন্টিনেন্টালের মতো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে লাভ করা কঠিন। পরিচালনা পর্ষদে সরকারের একজন প্রতিনিধি থাকতে পারেন, তবে পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

১০ বছর ধরে লোকসান

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত বিএসএলের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৮৭ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা। এর আগের চার অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৭৯ কোটি, ৮৬ কোটি, ১১১ কোটি ও ১৮০ কোটি টাকা।

এর আগের পাঁচ বছরেও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পরিমাণে লোকসান করেছে। ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের লোকসান জমে কোম্পানিটির মোট সঞ্চিত লোকসান ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনেও চলতি অর্থবছরে লোকসানের ধারা অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, একই ধরনের পাঁচতারকা হোটেল ওয়েস্টিন ও শেরাটন ঢাকার মালিকানায় থাকা ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৫২ কোটি টাকা নিট লাভ করেছে। এর আগের দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লাভ ছিল যথাক্রমে ১৫১ কোটি ও ১৮৯ কোটি টাকা।

৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএসএল পুঁজিবাজার থেকে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। করপোরেট সুকুক বা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে পাওয়া অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হবে। অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে সুকুক বা বন্ড ইস্যুসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করার কথা রয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে সুকুক বা বন্ড ইস্যু করা সম্ভব না হলে সপ্তম মাস থেকে সরকারকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকার ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে অর্থ দিতে হবে। তবে সুকুক বা বন্ড ইস্যু এবং সরকারকে অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে শেষ করতে হবে।

অবশিষ্ট ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে একই অর্থবছরের মধ্যে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে বিএসএল।

কয়েক দফা বৈঠকের পর চূড়ান্ত দেনা

অর্থ বিভাগের নথি অনুযায়ী, বিএসএলের ঋণের দায় নিরসনে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ, সুদ এবং বিএসএলের চূড়ান্ত দায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সংস্কারকাজের জন্য বিএসএল অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫৭৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে।

কমিটির হিসাবে, অগ্রণী ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাবে বিএসএলের কাছে পাওনা ছিল এক হাজার ৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সংশোধিত হিসাবে তা দাঁড়ায় এক হাজার ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পরে পরিচালনা পর্ষদের সম্মতিক্রমে ব্যাংক আগের এক হাজার ৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার হিসাব বহাল রাখতে পারে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

পরবর্তী সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের বোর্ড সভায় মোট দেনা থেকে ব্লকড হিসাবে থাকা ১২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪০৯ টাকা সমন্বয় করা হয়। একই সঙ্গে ৪১ কোটি ৮১ লাখ ১৩ হাজার ৬৯২ টাকা সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়। এর পর বিএসএলের চূড়ান্ত পরিশোধযোগ্য দেনা ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা নির্ধারণ করা হয়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18534 ,   Print Date & Time: Wednesday, 30 September 2026, 09:36:07 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh