
ইবি রিপোর্ট
ঢাকায় জীবিত মানুষের আবাসন সংকটের কথা প্রায়ই আলোচনায় আসে। কিন্তু একই শহরে নীরবে আরও একটি সংকট ঘনীভূত হচ্ছে—মৃত মানুষের শেষ ঠিকানার সংকট। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই নগরীতে সরকারি কবরস্থান মাত্র ১৩টি। মোট ২৫৩ একর জমির এসব কবরস্থানে দাফনের সক্ষমতা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জনের। ফলে প্রিয়জনকে ঢাকায় দাফন করতে চাইলেও অনেক পরিবারের সামনে এখন জায়গার পাশাপাশি খরচ ও কবর সংরক্ষণের অনিশ্চয়তাও বড় হয়ে উঠেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় কবরস্থানের জমি ১৯২ একর। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় রয়েছে ৬১ একর। প্রতিদিন নগরীতে নতুন করে মানুষের মৃত্যু হলেও কবরের জন্য জমি একই হারে বাড়ছে না। তাই পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার অনেক কবরস্থানের নিয়মিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোথাও নির্দিষ্ট সময় পর পুরনো কবরের জায়গায় নতুন মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। কোথাও স্বজনেরা কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে নিয়মিত অর্থ দিচ্ছেন। আবার সামর্থ্যবানদের জন্য ১৫ বা ২৫ বছর পর্যন্ত কবর সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য গুনতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা। ফলে মৃত্যুর পরও আর্থিক সক্ষমতা একজন মানুষের শেষ ঠিকানার স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলছে—এমন বাস্তবতা সামনে এসেছে।
বিশেষ করে বনানী কবরস্থানে জায়গার সংকট প্রকট। সেখানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। নতুন দাফনের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসায় সাধারণ কবর দুই বছর পর পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে প্রিয়জনকে দাফনের পর স্বজনদের একটি অনিশ্চয়তা থেকেই যায়—কত দিন থাকবে সেই কবর?
দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ অবশ্য রয়েছে। ডিএনসিসির কবরস্থান নীতিমালা অনুযায়ী, বনানীতে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে দিতে হয় ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে একই মেয়াদে ফি ৭৫ লাখ ও ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা। উত্তরা ১৪ নম্বরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা দিতে হয়। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে একই মেয়াদের জন্য ফি ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির বাইরে ব্যয় আরও বাড়ার অভিযোগও রয়েছে। বনানীতে ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে মোট ব্যয় সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
কবর সংরক্ষণ ঘিরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের রফিকুল ইসলাম মারা গেলে তাঁকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত দাফন ফি ১ হাজার টাকা হলেও সব মিলিয়ে তাঁদের প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। নামফলক, কবর সাজানো ও সাময়িক সংরক্ষণের জন্যও আলাদা অর্থ নেওয়া হয়। পরে কবর অক্ষত রাখতে মাসে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
কবর সাজানো, বাঁশের বেড়া দেওয়া, ঘাস লাগানো ও নিয়মিত পরিচর্যার নামেও ৩০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা এসব অর্থ আদায়ে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রায়েরবাজারে দীর্ঘদিন কাজ করা এক কর্মী এমন অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এর একটি অংশ সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মীদের কাছেও যায়। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ডিএনসিসির ‘কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২’-এ সাধারণ কবরের ওপর বাঁশ, ইট, লোহার গ্রিল বা অন্য কোনো স্থায়ী অবকাঠামো কিংবা বেড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ বাস্তবে এসবের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জায়গার সংকটের কারণে সংরক্ষিত কবরেও পরিবারের একাধিক সদস্যকে দাফনের নজির রয়েছে। কোনো কোনো কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে। তবে এ সুযোগ মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়দের নির্দিষ্ট কয়েকটি সম্পর্কের মধ্যেই সীমিত।
কবর সংরক্ষণের খরচও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ১৯৯৬ সালে বনানী ও উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে স্থায়ী কবরের জায়গা কিনতে খরচ হতো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তা ছিল ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী কবরের জায়গা কেনা বন্ধ থাকার পর ২০০৮ সালে মেয়াদভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়। ২০২৩ সালে ফি বাড়ানোর আগে বনানীতে ১৫ ও ২৫ বছরের সংরক্ষণে সর্বোচ্চ ফি ছিল যথাক্রমে ২৪ লাখ ও ৪৫ লাখ টাকা।
ডিএনসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান জানিয়েছেন, সাধারণ দাফনের খরচ বাড়ানো হয়নি। তাঁর ব্যাখ্যা, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে বেশি ফি নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কবর সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করা, যাতে ঢাকার সীমিত জায়গার ওপর চাপ আরও না বাড়ে।
তবে জায়গার সংকটের সঙ্গে স্বজনদের আবেগ ও সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ঢাকার সরকারি ১৩টি কবরস্থানের ২৫৩ একর জমি প্রায় তিন কোটি মানুষের নগরের জন্য যে অপ্রতুল, সেটি এখন পরিষ্কার। তাই নতুন কবরস্থান, বিদ্যমান কবরস্থানের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল নথি, ফি আদায়ে স্বচ্ছতা এবং অননুমোদিত অর্থ নেওয়া বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।