
ইবি রিপোর্ট
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুর ও ধ্বংসের ঘটনার চার দিন পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। কেন্দ্রটির একটি কক্ষ পরিষ্কার করে সেখানে সীমিত পরিসরে টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গতকাল সোমবারের তুলনায় আজ মঙ্গলবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি কক্ষে বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে সিলিং ফ্যান লাগানো হয়েছে। অন্যান্য কক্ষও পরিষ্কার করা হয়েছে এবং সেখানেও বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে পাখা বসানো হয়েছে। তবে এখনো পানির সংযোগ চালু হয়নি। শৌচাগারও পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা চালুর মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
কেন্দ্রটির পেছনের দিকে একটি বারান্দায় ইটের গাঁথুনি দিয়ে দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ চললেও ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর কেন্দ্রটির বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। এর পর শনিবার থেকে সীমিত পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দুই দিন সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকা দেওয়া হলেও সোমবার থেকে কেন্দ্রের একটি ভাঙা কক্ষের ভেতরে টিকাদান শুরু করা হয়।
আজ কেন্দ্রটিতে আগের কয়েক দিনের তুলনায় মানুষের ভিড়ও কিছুটা কম দেখা গেছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা মানুষের ভোগান্তিও কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছেলেকে টিকা দিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা তুহিন খান। তাঁর ছেলে তাহান খানের বয়স ১৬ মাস।
তুহিন খান বলেন, আগের ও বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে কোনো মিল নেই। আগে জায়গাটি সুন্দর ছিল এবং তাঁরা ভালোভাবে স্বাস্থ্যসেবা পেতেন। এখন পুরো এলাকা ভাঙাচোরা ও ময়লাযুক্ত হয়ে গেছে।
হামলার পর শনিবার ছেলেকে টিকা দিতে এসে ভিড়, ধুলাবালু ও অনিরাপদ পরিবেশ দেখে ফিরে গিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে আজ এসে তুলনামূলক ভালো পরিবেশ পেয়েছেন এবং ছেলেকে টিকা দিতে পেরেছেন বলে জানান তুহিন।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, হামলার পর প্রথম দিন কেন্দ্রের বাইরে বসেই টিকাদান কার্যক্রম চালাতে হয়েছিল। এখন কেন্দ্রের অবশিষ্ট অবকাঠামোর মধ্যেই সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, একটি কক্ষ প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির টিকা এবং হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির টিকা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব সাধারণ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রয়োজন হয় না, সেসব সেবাও সীমিত পরিসরে দেওয়া যাচ্ছে।
তবে গর্ভবতী মায়েদের সেবা, প্রসব-পরবর্তী সেবা, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিসেবা পুরোপুরি চালু করতে অবকাঠামো সংস্কার প্রয়োজন বলে জানান নাসরিন আখতার।
তিনি বলেন, এসব সেবা চালু করতে রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধাগুলোও পুরোপুরি চালু করা জরুরি।
নাসরিন আখতার জানান, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাঁদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী কেন্দ্রটির অবশিষ্ট স্থাপনা সংস্কার করে কাজের উপযোগী করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করেছেন। পানি ও বিদ্যুতের বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শৌচাগারের কাজও শুরু হয়েছে। এসব কাজ দ্রুত শেষ হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
পুরো অবকাঠামো সংস্কার হলে আগের মতো বিস্তৃত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শন করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এটি শুধু ভাঙচুরের ঘটনা নয়; স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিভিন্ন জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে ইট, কাঠ, সিমেন্ট ও রড পর্যন্ত লুট করে নেওয়া হয়েছে।
একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে এবং এটি রাষ্ট্রের জন্য কী ধরনের দৃষ্টান্ত তৈরি করছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মান্নার দাবি, হামলাকারীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর চালালেও কাছাকাছি থাকা পুলিশ সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি। তাঁকে জানানো হয়েছে, ৯৯৯ নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, কারা হামলা করেছে এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত, তা পুরোপুরি বের করা প্রয়োজন। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাকে শুধু সম্পত্তি দখলের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন মান্না। তাঁর বক্তব্য, যদি এটি শুধু সম্পত্তি দখলের ঘটনা হয়, তাহলে এত বড় একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন হামলা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারল, সেটিও তদন্তের বিষয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, কোথাও কোনো স্থাপনা বা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।