• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | বাংলাদেশ > জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ সংকটে চাপে দেশের অর্থনীতি

জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ সংকটে চাপে দেশের অর্থনীতি

  • মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৩
  • ৭

---

 

ইবি রিপোর্ট

বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও। কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় এবং প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়ায় অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো, বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ভোগ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বোর্ড সভায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় সতর্ক থাকার কথা বলা হয়। অন্যদিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। জুলাইয়ে সংস্থাটি যেখানে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, দুই মাসের ব্যবধানে তা কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া বা কুইক রেসপন্স নিশ্চিত করা এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর সংস্কার নিয়েও অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় প্রধানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাতে। একই সঙ্গে কৃষি, শিল্প এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কাটি আসে পরিবহন খাতে। এরপর বাড়তে থাকে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এডিবির সেপ্টেম্বরের আঞ্চলিক মূল্যায়নেও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দাম ও অস্থিরতা—দুটিই বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগে গতি ফেরানো—দুই দিক সামলাতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদহার দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে হলে ঋণের খরচও বেশি থাকবে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন উদ্যোক্তারা।

অন্যদিকে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদহার কমানো হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে এক ধরনের কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

এডিবির সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্বল বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধান না হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। আর ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

আইএমএফও ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনকে জরুরি বলে মনে করেছে। সংস্থাটির মতে, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা দূর করা না গেলে অর্থনীতিতে টেকসই ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

আইএমএফের দৃষ্টিতে জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের সংকট আলাদা কোনো বিষয় নয়। বরং একটি ঝুঁকি অন্যটিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার যুক্ত হয়ে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি বজায় থাকলে ঋণের ব্যয় বেশি থাকবে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন উদ্যোক্তারা। আবার বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে সব ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলেও মনে করেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজও জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ দুটি খাত ঠিক না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না এবং বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী হবেন না।

তার মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে সক্ষমতা থাকার পরও অনেক শিল্পকারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একই সঙ্গে দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন মাশরুর রিয়াজ। তার মতে, মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগেও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগের ধীরগতি দেশের অর্থনীতিতে পরস্পরসম্পর্কিত চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে আইএমএফ ও এডিবির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18390 ,   Print Date & Time: Tuesday, 29 September 2026, 08:50:30 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh