
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য ‘বিপর্যয়কর বা অস্তিত্বের ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে—এমন সতর্কবার্তা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে যাচ্ছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেওয়া প্রসপেক্টাসে নিজেদের তৈরি এআই মডেলগুলোর সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা অ্যানথ্রোপিকের আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির উন্নত এআই মডেলগুলো ‘আত্মরক্ষামূলক আচরণ’ প্রদর্শন করতে পারে। এর মধ্যে বন্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করা, তথ্য গোপন বা কারচুপি করা এবং ব্ল্যাকমেইল বা হুমকির মতো আচরণ করার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনের নথিতে অ্যানথ্রোপিক বলেছে, তাদের অত্যন্ত উন্নত মডেল, প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাপ্লিকেশনের উন্নয়ন এবং নতুন নতুন ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এআই মডেলের মাধ্যমে ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সাধারণত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের নিজেদের পণ্য, ব্যবসা ও প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানায়। তবে অ্যানথ্রোপিকের এই সতর্কবার্তা তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী। কারণ প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে উন্নত এআই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য বিপর্যয়কর এমনকি অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করতে পারে।
অ্যানথ্রোপিক একই সঙ্গে এআইয়ের ব্যাপক সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পায়ন ও বিদ্যুতের মতো এআইও অর্থনীতি ও সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা না হলে এর মাধ্যমে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নিজেকে ‘নিরাপত্তা-প্রথম’ এআই গবেষণাগার হিসেবে তুলে ধরা অ্যানথ্রোপিক তাদের ২৬১ পৃষ্ঠার মূল প্রসপেক্টাসের প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা ঝুঁকির বিষয় ব্যাখ্যায় ব্যয় করেছে। বিপরীতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করা হয়েছে ৪৮ পৃষ্ঠা।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এআই মডেলগুলো তাদের মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা পরীক্ষার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠলে মডেলের নিরাপত্তা যাচাইয়ের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে। প্রশিক্ষণের সময় মডেলগুলো কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত কিছু সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যা বাজারে চালু করার পর কোনো বড় নিরাপত্তা ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত শনাক্ত নাও হতে পারে।
এআই গবেষকদের মধ্যেও এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মডেল যত বেশি সক্ষম হয়ে উঠছে, তত বেশি তারা কখন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে তা বুঝতে পারছে এবং সেই অনুযায়ী আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। এতে এআই মডেলের প্রকৃত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
অ্যানথ্রোপিকের নিরাপত্তা গবেষক ইভান হাবিংগার অনুমান করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। এই ধারণা প্রতিষ্ঠানটির সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের বক্তব্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এআই নিরাপত্তার ওপর জোর দিলেও এ খাতে বিনিয়োগের সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অ্যানথ্রোপিক নিজেই অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের আইপিও নথিতে নিরাপত্তা গবেষণায় মোট কত অর্থ ব্যয় করছে, তা প্রকাশ করেনি।
তবে চলতি মাসের শুরুতে অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছিল, জুলাইয়ের একটি নমুনা সপ্তাহে তাদের এআই গবেষণায় ব্যবহৃত কম্পিউটিং শক্তির মাত্র ৬ শতাংশ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ক্লড এআই মডেলের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা কার্যক্রমকে ‘অত্যধিক সম্পদ-নির্ভর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের সীমিত অর্থ ও সম্পদকে কম্পিউটিং শক্তি, উচ্চমূল্যের এআই বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপত্তা গবেষণার মধ্যে ভাগ করে নিতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছে অ্যানথ্রোপিক।
প্রতিষ্ঠানটির আয়ও নতুন মডেল উন্মোচনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। গ্রাহকদের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে আয় বাড়ে এবং নতুন মডেল চালু করাই সেই ব্যবহারের অন্যতম চালিকা শক্তি। ফলে এআই উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় শীর্ষ পর্যায়ে থাকতে অ্যানথ্রোপিককে ধারাবাহিকভাবে নতুন মডেল বাজারে আনতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে অ্যানথ্রোপিকের আইপিও প্রসপেক্টাসে উঠে আসা সতর্কবার্তা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েনকে সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও নিরাপদ এআই ব্যবস্থা তৈরি করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।