• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ > নিউগিনি প্রপার্টিজ ও মিরপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: গ্রেপ্তার ১৮, নেপথ্যের মূল ব্যক্তিরা অধরা

নিউগিনি প্রপার্টিজ ও মিরপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: গ্রেপ্তার ১৮, নেপথ্যের মূল ব্যক্তিরা অধরা

  • মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৫
  • ৯

---

 

ইবি রিপোর্ট

রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দুই অস্ত্রধারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দুই ঘটনাতেই হামলার নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী বা মূল ব্যক্তিদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার পেছনে জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। এ ঘটনায় হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম তদন্তে এসেছে। তাঁর বিষয়ে তদন্ত চলছে। সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার ৪ নম্বর আসামি গোলাম মহিউদ্দিনের নিউগিনি প্রপার্টিজের পাশে ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে। আশপাশের অন্যান্য জমি নিউগিনি প্রপার্টিজের মালিকানাধীন হওয়ায় তাঁর জমিতে যাতায়াতের জন্য প্রকল্পটির রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। এমনকি চলাচলের ফটকও নিউগিনি প্রপার্টিজের নিয়ন্ত্রণে।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, জমিতে যাতায়াতের বিষয়টি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থেকেই হামলার সূত্রপাত হতে পারে। তবে জমি-সংক্রান্ত আরও কোনো বিরোধ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

গত শনিবার দিবাগত রাতে নিউগিনি প্রকল্পের কার্যালয় ও আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরে সেখানে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাও হামলার শিকার হয়।

নিউগিনি প্রপার্টিজের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিয়াকত আলী জানিয়েছেন, হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।

এ ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ক্যান্টনমেন্ট থানা-পুলিশ। এরই মধ্যে থানা-পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) যৌথভাবে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ডিবি তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে একজন শাহ আলম অনিক, যিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। গ্রেপ্তার অন্যদের মধ্যে রয়েছেন মামুন, আসলাম, মুন্না, মিজানুর রহমান ও শাহরিয়ার মাহমুদ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হামলার সময় কারা এক্সক্যাভেটর ঘটনাস্থলে নিয়ে এসেছিল এবং হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল কারা, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়।

তদন্তে এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তাঁরা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি)-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে জানা গেছে। তবে ফেরদৌসী আহমেদ এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।

ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তকারীরা হামলার সময় ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর নিয়ে এসেছিল এবং কারা পুরো হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার আগে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে তাঁরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যান বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজেও বিষয়টির কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন লেলিনের কার্যালয়ের সামনে একদল লোক জড়ো হওয়ার দৃশ্য ফুটেজে দেখা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রসংলগ্ন বিভিন্ন মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস চলাচল করতে দেখা যায়।

স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ কয়েকজন একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিলেন এবং নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হানিফ মিয়ার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ রোববার রাতে মো. মিন্টু ও মো. মিলনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তাঁরা ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পরে সেখান থেকে মালামাল লুট করেন। তাঁদের কাছ থেকে লুট হওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার রাতে মো. সোহেল, মো. জুয়েল, জিহাদ হাসান ও মো. রাব্বিকে গ্রেপ্তার করে শাহ আলী থানার পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন অর্থের বিনিময়ে ভাঙচুরে অংশ নিয়েছিলেন।

শনিবার সন্ধ্যায় আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন মো. শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, মো. শাহ আলম, মো. আতিকুর রহমান, মো. কামরুল ইসলাম ও মো. শাকিল। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে শাহবাগ এলাকা থেকে ডিবি এবং একজনকে শাহ আলী এলাকা থেকে থানা-পুলিশ গ্রেপ্তার করে। রোববার আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে শাহ আলম ‘সমমনা দোকানদার সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক বলে জানা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও দখলের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান।

তিনি মনে করেন, এ ধরনের ঘটনাগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে সংঘটিত হামলার ঘটনায় শক্তিশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নূর খানের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে দেশ মব সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এমন কার্যকর বার্তা দিতে হবে, যাতে অপরাধীরা আইনের ভয় অনুভব করে।

নিউগিনি প্রপার্টিজ ও মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য এখন হামলার পরিকল্পনাকারী, নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং নেপথ্যে থাকা সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হামলার পেছনের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18371 ,   Print Date & Time: Tuesday, 29 September 2026, 08:11:28 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh