
ইবি রিপোর্ট
সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল একটি দেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান শক্তি। তবে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের শেষ ধাপ তৈরি হয় মানুষের মেধা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সস্তা ও বিপুল শ্রমশক্তিনির্ভর পুরোনো মডেল থেকে বেরিয়ে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের আলোচনায় বিনিয়োগকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি এবং শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিনিয়োগকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন ও বিনিয়োগকে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ শুধু সম্পদ তৈরি করবে না, উৎপাদন বাড়াবে; উৎপাদন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং সেই কর্মসংস্থান আয় ও রাজস্ব বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করবে।
পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। তার মতে, ঋণনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার দিকে যেতে হবে। এজন্য শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন দক্ষ শ্রমশক্তি, মানসম্মত কর্মসংস্থান ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও দক্ষতা বৃদ্ধিকে জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়েছেন।
তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাসে কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে শুধু অবকাঠামো, মূলধন কিংবা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে উন্নত হয়নি। একটি পর্যায়ে গিয়ে প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা এবং উদ্ভাবন।
দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশটি প্রথমে শ্রমনির্ভর শিল্প ও রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এর ফলে দক্ষ শ্রমশক্তির ওপর ভিত্তি করে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে উঠেছে।
তাইওয়ানের অভিজ্ঞতাতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। কৃষি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি ইলেকট্রনিকস, নির্ভুল উৎপাদন ও সেমিকন্ডাক্টরভিত্তিক শিল্পে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন প্রশ্ন শুধু কত মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, তা নয়; বরং তারা কতটা দক্ষ হয়ে উঠছে এবং অর্থনীতিতে সেই দক্ষতা কতটা কাজে লাগছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও শিল্প ও ব্যবসা খাতে নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মীর ঘাটতির কথা শোনা যায়। এতে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি ব্যবধানের বিষয় সামনে আসে।
এই ব্যবধান কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতকে একই দক্ষতা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কারিকুলাম তৈরির সময় শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া এবং কর্মজীবীদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। হিসাব, সফটওয়্যার, ডিজাইন, কনটেন্ট, গ্রাহকসেবা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের তরুণদের শুধু প্রচলিত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
সাকিফ শামীমের মতে, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও আরও পরিবর্তিত হবে। তখন কম শ্রমমূল্যের সুবিধার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান ও দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই শিক্ষা, দক্ষতা, শিল্পনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নীতিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি বড় ভিত্তি ছিল শ্রমনির্ভর শিল্প। তৈরি পোশাক খাত এর অন্যতম বড় উদাহরণ। বিপুল শ্রমশক্তিকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। তবে অর্থনীতির পরবর্তী ধাপে শুধু শ্রমের পরিমাণ দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
একই সংখ্যক মানুষকে দিয়ে আরও বেশি মূল্য তৈরি করতে হলে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। একজন কর্মী যদি নির্দিষ্ট একটি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন, তাহলে তার উৎপাদনশীলতার একটি সীমা থাকে। কিন্তু তিনি যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন, সমস্যার সমাধান করতে পারেন, নতুন পদ্ধতি শিখতে পারেন এবং কাজের মান উন্নত করতে পারেন, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়ে।
দক্ষ জনশক্তিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি প্রথমে শ্রমনির্ভর শিল্প ও রপ্তানির ওপর নির্ভর করলেও পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে উচ্চদক্ষ কর্মী তৈরি করে। এর সঙ্গে শিল্পের পরিবর্তনও ঘটে এবং অর্থনীতি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতের দিকে এগিয়ে যায়।
তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও শিক্ষা, গবেষণা অবকাঠামো এবং শিল্পের মধ্যে সংযোগ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই দক্ষ তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। এজন্য বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, নতুন শিল্প ও সেবা খাত তৈরি করা এবং এমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন যেখানে দক্ষতার যথাযথ মূল্য পাওয়া যায়।
অর্থাৎ শিক্ষা নীতি, দক্ষতা নীতি, শিল্পনীতি ও কর্মসংস্থান নীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কমে আসছে। অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে এসব নীতিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ দেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বদলাবে। কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও দক্ষ জনশক্তি ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গত কয়েক দশকে তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো বদলেছে। এখন পরবর্তী ধাপে সেই ভিত্তির ওপর জ্ঞান ও দক্ষতানির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
এজন্য এমন একটি শিক্ষা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ কর্মী এবং নতুন ধারণা তৈরিতে সক্ষম মানুষ তৈরি করবে। একই সঙ্গে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংযোগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ তাই শুধু কোনো একটি অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে কার্যকর বিনিয়োগই অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনশীল ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতের দিকে নিতে পারে। মানুষের সক্ষমতা যত বাড়বে, শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রসর হওয়ার সুযোগও তত বাড়বে।