• হোম > দেশজুড়ে > লোডশেডিং ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিতে সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প

লোডশেডিং ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিতে সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প

  • সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৮
  • ২৭

---

 

ইবি রিপোর্ট

বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং, সুতা, রঙ, কেমিক্যাল ও তাঁতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের তাঁতিরা। উৎপাদন খরচ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই তুলনায় বাজারে কাপড়ের দাম বাড়াতে পারছেন না তারা। ফলে লোকসান গুনতে গুনতে জেলার অনেক তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

তাঁতিদের ভাষ্য, গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে এ পরিস্থিতি চলছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক সময় জেনারেটর দিয়ে তাঁত চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শ্রমিক না পাওয়ায় অনেক তাঁত কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, বেলকুচি, এনায়েতপুর, রায়গঞ্জ, চৌহালী ও কাজীপুর এলাকায় ৩ লাখের বেশি তাঁত রয়েছে। এসব তাঁতশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ তাঁতি পরিবার জড়িত।

সিরাজগঞ্জে উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি জেলার তাঁতপণ্য ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হয়ে থাকে। স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়ায় সিরাজগঞ্জকে তাঁতশিল্পে ব্র্যান্ডিং করে ‘তাঁতকুঞ্জ সিরাজগঞ্জ’ নাম দেওয়া হয়েছে।

তবে বর্তমানে নানা সংকটে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটি কঠিন সময় পার করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁত মালিকদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। বর্তমানে ৬০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতা ২৯৩ থেকে ২৯৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ দুই মাস আগেও একই সুতার দাম ছিল ২৭৫ থেকে ২৮০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি পাউন্ডে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা।

এ ছাড়া অন্যান্য ধরনের সুতার দামও প্রতি পাউন্ডে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান তাঁতিরা।

শুধু সুতা নয়, তাঁতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। বর্তমানে কোরিয়ান স্যামসং একটি মাকুর দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা, যা দেড় মাস আগে ছিল ১ হাজার ২০ টাকা। চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা তাঁতের অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং তাঁতিদের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক তাঁত মালিককে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। জেনারেটর চালাতে বর্তমানে প্রতি লিটার তেলের জন্য প্রায় ১০৬ টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামের তাঁতি আমিরুল ইসলাম বলেন, সুতার দাম বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিং ও যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধিতে তাঁতে কাপড় উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদিত কাপড় হাটে আগের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

তার ভাষায়, উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলার খুকনী গ্রামের তাঁতি সোহরাব আলী বলেন, বর্তমানে তাঁতিরা চরম লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। এর ওপর শ্রমিক সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কাপড় উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর দাবি করছেন। কিন্তু সুতা, রঙ, কেমিক্যাল ও যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলে বাজারে কাপড় চাহিদামতো বিক্রি না হলে শ্রমিকদের বাড়তি মজুরি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

উল্লাপাড়া উপজেলার বালসাবাড়ি গ্রামের তাঁতি আমীর হোসেন বলেন, তাঁতশিল্পের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সুতা, রঙ ও তাঁতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের দাম কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. বদিউজ্জামান বলেন, বর্তমানে নানা অজুহাতে সুতার দাম বাড়ানো হচ্ছে। কয়েক দিন পরপরই ব্যবসায়ীরা প্রতি পাউন্ডে সাত থেকে আট টাকা করে দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিং অব্যাহত থাকায় জেলার অনেক তাঁত ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, সিরাজগঞ্জ তাঁতশিল্পপ্রধান এলাকা এবং এই শিল্পের ওপর স্থানীয় অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। গ্রামভিত্তিক তাঁতশিল্পের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিও সচল থাকে।

তাই এই শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁতশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বেলকুচি তাঁত উন্নয়ন বোর্ডের লিয়াজোঁ অফিসার তম্বি বলেন, তাঁতে ব্যবহৃত রঙ, সুতা ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে বর্তমানে তাঁতশিল্প ঝিমিয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিরাজগঞ্জের লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই শিল্প দীর্ঘদিন সংকটে থাকলে এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। তাই তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে লোডশেডিং কমানো, সুতা ও যন্ত্রাংশের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁতি ও স্থানীয় সচেতন মহল।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18330 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 01:05:32 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh